ইরানের অনুমতি ছাড়া হরমুজ পাড়ি দেওয়া ‘অগ্রহণযোগ্য ও বিপজ্জনক’, জাহাজ চলাচলে হুঁশিয়ারি তেহরানের
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) বুধবার জাহাজমালিকদের সতর্ক করে জানিয়েছে, তেহরানের সঙ্গে সমন্বয় ছাড়া হরমুজ প্রণালিতে নির্ধারিত যেকোনো নতুন নৌপথ 'অগ্রহণযোগ্য ও বিপজ্জনক;। বাহিনীটি আরও হুঁশিয়ারি দিয়েছে, তাদের নির্দেশনা উপেক্ষা করা জাহাজগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বৃহস্পতিবার দেশটির সংবাদমাধ্যম প্রেস টিভিতে প্রচারিত এক বিবৃতিতে আইআরজিসি নৌবাহিনী জানায়, তেহরানকে না জানিয়ে বা কোনো আলোচনা না করেই 'কিছু কর্তৃপক্ষ' এই নতুন পথটি তৈরি করেছে। তবে ওই বিবৃতিতে 'কর্তৃপক্ষ' বলতে কাদের বোঝানো হয়েছে তা সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি।
আইআরজিসি স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, কেবল ইরানের নির্ধারিত নৌপথগুলোই বৈধ হিসেবে গণ্য হবে এবং জাহাজগুলোকে অবশ্যই তাদের নৌবাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলতে হবে। বাহিনীর পক্ষ থেকে আরও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে, নির্ধারিত সীমানার বাইরে গেলে সংশ্লিষ্ট জাহাজের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তেহরানের এই কঠোর হুঁশিয়ারি এটাই স্পষ্ট করে, তারা হরমুজ প্রণালির ওপর নিজের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে এবং তাদের অনুমতি ছাড়া যেকোনো ধরণের চলাচল রুখে দিতে বদ্ধপরিকর। গত সপ্তাহে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই জ্বালানি পথটি পুনরায় খুলে দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক সই হলেও, জাহাজ মালিকদের মনে দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা রয়েই গেছে।
গত শনিবার একটি প্রভাবশালী নৌ-তথ্য সরবরাহকারী গোষ্ঠী বিকল্প শিপিং করিডোরের প্রস্তাব দেওয়ার পর ইরানের পক্ষ থেকে এই নতুন সতর্কতা জারি করা হলো। ওই গোষ্ঠীটি জাহাজ মালিকদের ওমানের জলসীমা দিয়ে দক্ষিণের রুট ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছিল এবং ট্রান্সপন্ডার সিগন্যাল সচল রাখার অনুরোধ করেছিল। তাদের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল, 'ওমানি জলসীমার দক্ষিণ রুটটি মাইন-মুক্ত হিসেবে নিশ্চিত করা হয়েছে এবং এটিই চলাচলের জন্য সুপারিশকৃত পথ।'
শিপ-ট্র্যাকিং ডেটা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান মেরিন ট্রাফিকের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে জাহাজ চলাচলে কিছুটা উন্নতির আভাস পাওয়া যাচ্ছে। গত সপ্তাহের শেষে ৯৩টি জাহাজ এই পথ পার হয়েছে, যা আগের একই সময়ের তুলনায় তিনগুণ। তবে এটি যুদ্ধপূর্ব পরিস্থিতির তুলনায় অনেক কম, যখন প্রতিদিন ১০০টিরও বেশি জাহাজ এই প্রণালি দিয়ে নিয়মিত চলাচল করত।
মেরিন ট্রাফিক আরও নিশ্চিত করেছে, গত মঙ্গলবার বাণিজ্যিক ও জ্বালানি বহনকারী ৩১টি জাহাজ এই প্রণালী পার হয়েছে। জাহাজ মালিকরা বর্তমানে ইরান, ওমান এবং আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার নির্ধারিত রুটগুলোর একটি মিশ্রণ ব্যবহার করছেন। তবে সংস্থাটি বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, 'অপারেটররা এখনও অত্যন্ত সতর্কভাবে চলাচল করছেন এবং পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসেনি।'
গত মে মাসে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় ইরানের পারস্য উপসাগরীয় প্রণালি কর্তৃপক্ষের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে এবং একে বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাণিজ্যে 'চাঁদাবাজি' চেষ্টা হিসেবে অভিহিত করেছে। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ওয়াশিংটন হরমুজ প্রণালিতে কোনো ধরণের টোল বা ফি আদায় ব্যবস্থা সহ্য করবে না এবং এর সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন, হরমুজ প্রণালিতে ইরানের যেকোনো ধরণের নিয়ন্ত্রণ তেলের বিশ্ববাজারে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলতে পারে। তেহরান যদি এই জলপথের ওপর কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখে, তবে জাহাজ চলাচল হয়তো আর কখনো যুদ্ধপূর্ববর্তী অবস্থায় ফিরবে না।
আরবিসি ক্যাপিটাল মার্কেটসের হেলিমা ক্রফ্ট বৃহস্পতিবার গ্রাহকদের উদ্দেশ্যে এক বার্তায় বলেন, 'আমাদের মতে, সংঘাত শেষ হওয়ার পর যদি ইরান এই প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাব বজায় রাখে, তবে এই জলপথ দিয়ে তেলের প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে।'
