ট্রাম্পের ইরান যুদ্ধ বন্ধের পক্ষে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের ভোট: কতটা কার্যকর হবে এই পদক্ষেপ?
ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধ বন্ধের পক্ষে ভোট দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদ। এমন এক সময়ে এই ভোটাভুটি হলো যখন এই যুদ্ধ চতুর্থ মাসে পদার্পণ করেছে। এরমধ্যে শান্তি আলোচনা নিয়েও উভয় পক্ষই এখনো অনমনীয় অবস্থানে রয়েছে।
বুধবারের এই ভোটকে মার্কিন আইনপ্রণেতাদের প্রথম সফল প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে, যার লক্ষ্য হাজার হাজার বেসামরিক মানুষের মৃত্যু থেকে শুরু করে—বিশ্ব বাণিজ্যে বিপর্যয় ডেকে আনা—এই বিধ্বংসী সংঘাত বন্ধে মার্কিন প্রশাসনকে বাধ্য করা।
যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় এর প্রভাব সাধারণ আমেরিকানদের ওপর পড়তে শুরু করেছে। এরমধ্যে ইরানের সঙ্গে একটি সুনির্দিষ্ট ও স্থায়ী চুক্তিতে পৌঁছাতেও ব্যর্থতার পরিচয়য় দিচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন। এই অবস্থায়, ট্রাম্পের নিজ দল- রিপাবলিকান পার্টির ভেতরেও এই যুদ্ধের বিরোধিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। কংগ্রেসে এই ভোটাভুটির ফল তারও প্রতিফলন।
তবে আপাতত এটি মূলত একটি প্রতীকী পদক্ষেপ হিসেবেই থেকে যাবে। কারণ আইন পাসের ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের 'ভেটো' দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে এবং প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেটে রিপাবলিকানদের আধিপত্য রয়েছে। অবশ্য এটি আইনপ্রণেতাদের পক্ষ থেকে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রতি একটি বড় ধরনের তিরস্কার।
এখানে তুলে ধরা হলো এনিয়ে মার্কিন রাজনীতিতে ঠিক কী ঘটেছিল, কেন এই পদক্ষেপটি গুরুত্বপূর্ণ এবং কেন এর মানে এই নয় যে ট্রাম্প ইরানের ওপর নতুন কোনো হামলা চালাতে পারবেন না বা চালাবেন না:
কী ঘটেছিল?
বুধবার প্রতিনিধি পরিষদের ডেমোক্র্যাটের নেতৃত্বে আইনপ্রণেতারা 'ওয়ার পাওয়ার্স অ্যাক্ট' (যুদ্ধ ক্ষমতা আইন) কার্যকরের পক্ষে ভোট দেন। এই আইন অনুযায়ী, বিদেশে কোনো সশস্ত্র সংঘাতে জড়ানোর পর প্রেসিডেন্ট যদি কংগ্রেসের অনুমোদন না পান, তবে কংগ্রেস জোরপূর্বক সেই যুদ্ধ বন্ধের ক্ষমতা রাখে।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ডেমোক্র্যাটরা যুক্তি দিয়ে আসছেন যে, যুদ্ধ ঘোষণার অধিকার একমাত্র কংগ্রেসের, প্রেসিডেন্টের নয়। এই যুক্তির ওপর ভিত্তি করেই তারা ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ বন্ধ করতে বারবার চেষ্টা চালিয়ে আসছেন।
ট্রাম্প প্রশাসন এর বিপরীতে দাবি করেছে যে, ইরানে সামরিক অভিযান পরিচালনার জন্য কংগ্রেসের অনুমোদনের কোনো প্রয়োজন নেই। যদিও ১৯৭৩ সাল থেকে কার্যকর থাকা 'ওয়ার পাওয়ার্স অ্যাক্ট' অনুযায়ী, কোনো সশস্ত্র সংঘাতে জড়ানোর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে অবশ্যই আইনপ্রণেতাদের অনুমোদন নিতে হবে।
কেবল যুক্তরাষ্ট্রের ওপর তাৎক্ষণিক বা আসন্ন কোনো হামলার আশঙ্কা থাকলেই প্রেসিডেন্ট একতরফাভাবে সেনা মোতায়েন করতে পারেন। এমন পরিস্থিতিতে, প্রেসিডেন্টকে অবশ্যই ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কংগ্রেসকে অবহিত করতে হবে। এরপর কংগ্রেস যদি যুদ্ধ ঘোষণা না করে, তবে যুদ্ধ শুরুর ৬০ দিনের মধ্যে প্রেসিডেন্টকে সেখান থেকে সেনা প্রত্যাহার করে নিতে হবে।
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ক্ষেত্রে সমালোচকেরা যুক্তি দেখিয়েছেন যে, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর এমন কোনো তাৎক্ষণিক হুমকি ছিল না; বরং যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলই প্রথমে আঘাত হেনেছিল। ট্রাম্প যুদ্ধ শুরুর ৬০ দিনের মাথায় (যা গত ২৯ এপ্রিলের কাছাকাছি সময়ে পূর্ণ হয়েছে) যুদ্ধে নিয়োজিত হাজার হাজার মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করতেও ব্যর্থ হয়েছেন।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে এই যুদ্ধ শুরু করার পর থেকে প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যালঘু আসনে থাকা ডেমোক্র্যাটরা এই আইনটি কার্যকর করার জন্য তিনবার চেষ্টা করেছিলেন। তবে আগের সবকটি প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হয়েছিল।
প্রতিনিধি পরিষদে কেমন ছিল ভোটের সমীকরণ?
বুধবারের ভোটাভুটিতে ট্রাম্পের ক্ষমতা সীমিত করার প্রস্তাবের পক্ষে ২১৫টি এবং বিপক্ষে ২০৮টি ভোট পড়ে। ডেমোক্র্যাটদের এই সাফল্য আসে যখন চারজন রিপাবলিকান সদস্য তাঁদের দলীয় অবস্থান থেকে সরে এসে প্রস্তাবটির পক্ষে ভোট দেন, যা ট্রাম্পের নীতির প্রতি একটি প্রকাশ্য তিরস্কার হিসেবে দেখা হচ্ছে।
যুদ্ধের শুরুতে রিপাবলিকানরা জনসমক্ষে এই যুদ্ধকে জোরালোভাবে সমর্থন করলেও, মার্কিন অর্থনীতি এবং বিশ্ববাণিজ্যে এর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ার কারণে দলটির ভেতরের আবহাওয়া লক্ষণীয়ভাবে বদলে গেছে। পাশাপাশি ট্রাম্পের জনপ্রিয়তার রেটিংও ব্যাপকভাবে হ্রাস পেয়েছে।
দুই সপ্তাহ আগে যখন সর্বশেষ ভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল, তখন মিশিগানের টম ব্যারেট, ওহাইওর ওয়ারেন ডেভিডসন এবং কেনটাকির থমাস ম্যাসি দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে ভোট দিয়েছিলেন। আর বুধবার তাঁদের সাথে যোগ দেন পেনসিলভানিয়ার ব্রায়ান ফিটজপ্যাট্রিক।
এই ভোট কি ট্রাম্পের যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষমতাকে সীমিত করবে?
পাকাপোক্তভাবে তা বলা যায় না। এই মুহূর্তে এই 'হ্যাঁ' ভোটটি মূলত প্রতীকী। প্রস্তাবটি কার্যকর করতে হলে, উচ্চকক্ষ সিনেটেও এটি পাস হতে হবে, তবে সেখানেও রিপাবলিকানদের সামান্য ব্যবধানের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে।
সিনেটের ডেমোক্র্যাটরা যুদ্ধ বন্ধে বাধ্য করার প্রক্রিয়া শুরু করতে বারবার ভোটের জন্য চাপ দিলেও, রিপাবলিকান সিনেটরেরা এখন পর্যন্ত সেই প্রস্তাবগুলো প্রত্যাখ্যান করার মতো পর্যাপ্ত ভোট ধরে রাখতে পেরেছেন।
যুদ্ধ থেকে সেনা প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার জন্য দুই সপ্তাহ আগে ১০০ সদস্যের সিনেটে সর্বশেষ ভোটটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যার ফলাফল ছিল ৫০-৪৭। চারজন রিপাবলিকান সদস্য ডেমোক্র্যাটদের সাথে যোগ দিয়ে প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিলেও, পেনসিলভানিয়ার সিনেটর জন ফেটারম্যান ছিলেন একমাত্র ডেমোক্র্যাট যিনি এই প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দেন।
যদিও এই ফলাফল রিপাবলিকান সিনেটরদের মধ্যেও ক্রমবর্ধমান অসন্তোষের প্রতিফলন ঘটায়, তবে তা প্রস্তাব পাসের জন্য যথেষ্ট ছিল না।
এমনকি সিনেট যদি প্রতিনিধি পরিষদকে অনুসরণ করে ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের যুদ্ধের ওপর সীমাবদ্ধতা আরোপের প্রস্তাব পাসও করে, তাহলেও ট্রাম্প চাইলে সেই প্রস্তাবে 'ভেটো' দিতে পারেন।
তেমন পরিস্থিতিতে, প্রেসিডেন্টের ভেটো বাতিল (ওভাররাইড) করতে কংগ্রেসকে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় এই প্রস্তাব পাস করতে হবে। এটি অসম্ভব না হলেও বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে কিছুটা অবাস্তব; কারণ কিছু রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা অসন্তুষ্ট হলেও দলটির সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ এখনো প্রকাশ্যে ট্রাম্পকে সমর্থন করছেন।
আইনি সংজ্ঞায় যুক্তরাষ্ট্র কি সত্যিই এখন যুদ্ধে লিপ্ত?
এরপর প্রশ্ন ওঠে যে, যুক্তরাষ্ট্র এই মুহূর্তে আদৌ কোনো যুদ্ধে লিপ্ত আছে কি না এবং এই প্রস্তাবটি আদৌ প্রযোজ্য হবে কি না। গত ৮ এপ্রিল থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর রয়েছে, যদিও তা অত্যন্ত দুর্বল। ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তি হলো, এর অর্থ হলো যুক্তরাষ্ট্র কার্যত এই মুহূর্তে কোনো যুদ্ধে লিপ্ত নেই।
গত ১ মে ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন যে যুদ্ধবিরতির মানে হলো শত্রুতার "অবসান", যদিও যুক্তরাষ্ট্র এখনো ইরানের বন্দরগুলো অবরুদ্ধ করে রেখেছে এবং ইরানি জাহাজে হামলা চালাচ্ছে। তেহরানও হরমূজ প্রণালী অবরুদ্ধ করে রেখেছে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও গত মঙ্গল ও বুধবার ইরান যুদ্ধ নিয়ে আয়োজিত একাধিক শুনানিতে আইনপ্রণেতাদের সামনে এই যুক্তিটিই তুলে ধরেন। আইনপ্রণেতারা তাঁকে ইরানের সংঘাত থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার এবং ভেনিজুয়েলা নিয়ে বিস্তারিত পরিকল্পনা জমা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। গত জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে অপহরণ করে।
শুনানিতে ডেমোক্র্যাট সিনেটর কোরি বুকারের সাথে এক উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের সময় রুবিও জোর দিয়ে বলেন, "ইরান যুদ্ধ শেষ।" তবে সিনেটের বৈদেশিক সম্পর্ক কমিটির ডেমোক্র্যাট সদস্য সিনেটর জিন শাহিন রুবিওকে জবাবদিহিতার অভাব এবং কংগ্রেসকে সঠিক তথ্য না দেওয়ার জন্য অভিযুক্ত করেন।
তিনি বলেন, "যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরানের ওপর হামলা চালাচ্ছিল এবং ইরান মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে মার্কিন দূতাবাস ও ঘাঁটিগুলোতে বোমা হামলা চালাচ্ছিল, তখন আপনি কংগ্রেসে যুদ্ধ ক্ষমতার নোটিফিকেশন পাঠিয়ে বলেছিলেন যে, আমরা ইরানের সাথে কোনো সক্রিয় শত্রুতায় লিপ্ত নই।"
তিনি আরও যোগ করেন, "সেটি কোনো আলোচনা বা পরামর্শ ছিল না; সেটি ছিল মূলত এই যুদ্ধ নিয়ে এই কমিটি এবং কংগ্রেসের কাছে জবাবদিহি করা এড়িয়ে যাওয়ার একটি চেষ্টা।"
যুক্তরাষ্ট্র কি ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে যুদ্ধ শুরু করতে পারে?
ট্রাম্পের মন্ত্রিসভার কিছু কর্মকর্তা মনে করেন যে তা সম্ভব।
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ গত ১২ মে দাবি করেছেন যে, ওয়ার পাওয়ার্স অ্যাক্টের অধীনে প্রেসিডেন্টকে সেনা মোতায়েনের জন্য যে ৬০ দিনের সময় দেওয়া হয়, ৮ এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির কারণে সেই সময়সীমা পুনরায় নতুন করে (রিসেট) শুরু হয়েছে। ফলে প্রশাসন চাইলে আইনপ্রণেতাদের অনুমোদন ছাড়াই আবারও ইরানে হামলা শুরু করতে পারে।
সিনেটের অ্যাপ্রোপ্রিয়েশন কমিটির সামনে দেওয়া সাক্ষ্যে হেগসেথ মূলত যুক্তি দেখিয়েছেন যে, ৮ এপ্রিলের যুদ্ধবিরতি মূল সময়সীমাকে নতুন করে চালুর সুযোগ করে দিয়েছে। তিনি বলেন, "প্রেসিডেন্ট যদি ইরানের বিরুদ্ধে আবারও যুদ্ধ শুরু করার সিদ্ধান্ত নেন, তবে তা করার জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত কর্তৃত্ব আমাদের হাতে থাকবে।"
