৪৯ বছরের রেকর্ড ভাঙার পথে অভিনেতা বিজয়: তামিলনাড়ু নির্বাচনে নতুন সমীকরণ
তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে যদি জোসেফ বিজয় চন্দ্রশেখর জয়ী হন, তবে তিনি গত ৪৯ বছরের ইতিহাসকে নতুন করে লিখবেন। ১৯৭৭ সালে এম. জি. রামচন্দ্রন (এমজিআর) যেভাবে রাজনীতির গতিপথ বদলে দিয়ে রাজ্যের প্রথম অভিনেতা-মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন, বিজয়ের সামনে এখন সেই একই অর্জনের হাতছানি।
সবশেষ ১৯৭৭ সালের নির্বাচনে চলচ্চিত্র জগৎ সরাসরি তামিলনাড়ুর প্রশাসনিক কেন্দ্র 'ফোর্ট সেন্ট জর্জ' দখল করেছিল। সেবার এমজিআর বিপুল জনসমর্থন নিয়ে জয়ী হয়ে ১৯৮৭ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এক দশক শাসন করেন। তিনি ভক্তদের উন্মাদনাকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রাজনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করেছিলেন এবং জনকল্যাণকে ভোটারদের সঙ্গে এক আবেগীয় চুক্তিতে পরিণত করেছিলেন।
এমজিআর-এর পর অনেক জনপ্রিয় অভিনেতা চেষ্টা করলেও কেউ সেই চূড়ান্ত নির্বাচনী বাধা পার হতে পারেননি। জয়ললিতা একজন বড় চলচ্চিত্র তারকা হওয়া সত্ত্বেও, তিনি নিজের কোনো নতুন রাজনৈতিক দল গঠন না করে বরং এমজিআর-এর প্রতিষ্ঠিত এআইএডিএমকে দলের উত্তরাধিকার গ্রহণ করে রাজনীতিতে আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন।
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের গতিপ্রকৃতি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, বিজয়ের মাত্র দুই বছর বয়সী দল 'তামিলাগা ভেট্টি কাঝাগম' ১০০ থেকে ১১৮টি আসনের আশেপাশে অবস্থান করছে। ২৩৪ সদস্যের বিধানসভায় সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য ১১৮টি আসন প্রয়োজন। এমনকি ন্যূনতম ১০০টি আসন পেলেও বিজয় রাজ্য রাজনীতির শীর্ষ সারিতে নিজের জায়গা পাকাপোক্ত করবেন; আর ১১৮ ছুঁতে পারলে তা হবে এক বিস্ময়কর উত্থান।
অন্যান্য অভিনেতাদের মতো বিজয় হুট করে রাজনীতিতে আসেননি। ২০০৯ সাল থেকেই তিনি তাঁর ভক্তদের 'বিজয় মাক্কাল ইয়াক্কাম' সংগঠনের মাধ্যমে সংগঠিত করতে শুরু করেন। ত্রাণ কাজ, শিক্ষা সহায়তা এবং স্থানীয় বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে কাজ করার মাধ্যমে এই সংগঠনটি তৃণমূল পর্যায়ে পরিচিতি পায়। ২০১১ সালে এটি এআইএডিএমকে নেতৃত্বাধীন জোটকে সমর্থন দিয়ে প্রথমবারের মতো সরাসরি রাজনৈতিক পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়।
২০১৯ সালে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের (সিএএ) সমালোচনা করে বিজয় তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের স্পষ্ট জানান দেন। তাঁর চলচ্চিত্রকেন্দ্রিক বিভিন্ন অনুষ্ঠান, অডিও লঞ্চ এবং ভক্তদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় তিনি কেবল সিনেমা নিয়ে নয়, বরং পরীক্ষা নিয়ে মানসিক চাপ, বেকারত্ব, দুর্নীতি এবং সুশাসনের মতো বিষয়গুলো নিয়ে সরব হন। ২০২১ সালের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিজয়ের সংগঠনের প্রার্থীদের বড় জয় প্রমাণ করে যে, তাঁর জনপ্রিয়তা কেবল ভিড় জমানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা ভোট বক্সেও প্রতিফলিত হতে পারে।
২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে 'তামিলাগা ভেট্টি কাঝাগম' (টিভিকে) চালুর সময় বিজয় অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নামেন। তিনি ঘোষণা করেন, ২০২৬ সালের নির্বাচনে তাঁর দল এককভাবে লড়াই করবে এবং ডিএমকে-এআইএডিএমকে-এর দ্বিমেরু শাসনের বিপরীতে একটি স্বচ্ছ বিকল্প হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে। এই ঘোষণার পরই তিনি তিন দশকের অভিনয় ক্যারিয়ার এবং ৭০টি মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমা শেষে রূপালি জগত থেকে বিদায় নেন। তাঁর এই সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের কাছে বার্তা দেয় যে, রাজনীতি তাঁর কাছে কোনো 'পার্ট টাইম' কাজ নয়।
টিভিকে বিগত দুই বছর ধরে একটি শিথিল ভক্ত-কাঠামোকে জেলা কমিটি, নির্বাচনী ইউনিট এবং বুথ-পর্যায়ের টিমের মাধ্যমে একটি আনুষ্ঠানিক দলে রূপান্তর করেছে। বিজয় নিজেকে প্রথাগত বাগ্মী নেতার পরিবর্তে একজন ভালো শ্রোতা হিসেবে তুলে ধরেছেন, যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও জনসভাগুলোতে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।
বিজয়ের রাজনৈতিক যাত্রা যে পুরোপুরি মসৃণ ছিল তা নয়। ২০২৫ সালে কারুরে টিভিকে-র একটি অনুষ্ঠানে পদপিষ্ট হয়ে হতাহতের ঘটনা তাঁকে প্রথম বড় সংকটের মুখে ফেলে। নেতৃত্বের জবাবদিহিতা এবং সাংগঠনিক শৃঙ্খলার প্রশ্নে ওই সময় তিনি অত্যন্ত পরিমিত ও সংশোধনমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন, যা তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতার আগাম ইঙ্গিত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিজয় যদি সরাসরি সংখ্যাগরিষ্ঠতা নাও পান, তবুও ১১০টির মতো আসন পেলে তিনি সরকার গঠনের মধ্যমণি হয়ে উঠবেন। প্রাক-নির্বাচনী কোনো জোট না করায় নির্বাচনের পরবর্তী যেকোনো পদক্ষেপ তাঁর 'অ্যান্টি-এস্টাবলিশমেন্ট' বা প্রচলিত শাসনবিরোধী অবস্থানের জন্য কঠোরভাবে পর্যালোচিত হবে।
গঠনগতভাবে, তামিলনাড়ু এখন একটি শক্তিশালী ত্রিপক্ষীয় লড়াইয়ের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে ডিএমকে নেতৃত্বাধীন ফ্রন্ট, অন্যদিকে দুর্বল হলেও অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা এআইএডিএমকে এবং তৃতীয় শক্তি হিসেবে বিজয়ের টিভিকে। ছোট দলগুলো, যারা দীর্ঘদিন দ্রাবিড় দলগুলোর ওপর নির্ভরশীল ছিল, তারা এখন তৃতীয় একটি আশ্রয় খুঁজে পাচ্ছে।
এমজিআর-এর সঙ্গে বিজয়ের তুলনা অনিবার্য হলেও তা সম্পূর্ণ নয়। এমজিআর যেখানে একটি নাটকীয় বিভাজন এবং জনকল্যাণমুখী জনমোহিনী তরঙ্গে চড়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন, সেখানে বিজয়ের আবেদন হলো বর্তমান প্রজন্মের উদ্বেগ, সুশাসনের অভাব এবং একটি স্বচ্ছ পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি। ২০২৬ সালে বিজয় কি ফোর্ট সেন্ট জর্জে পা রাখবেন, নাকি প্রমাণ করবেন যে এমন মুহূর্ত এখন আর অসম্ভব কিছু নয়—সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। তামিলনাড়ুর রাজনীতির ব্যাকরণ যে ইতিমধ্যে বদলে গেছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
