মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ‘জেরাল্ড আর ফোর্ড’ মেরামতে লাগতে পারে দীর্ঘ ১৪ মাস
রেকর্ড গড়া টানা ৩০০ দিনেরও বেশি সময় মোতায়েন শেষে অবশেষে স্বদেশে ফিরছে মার্কিন নৌবাহিনীর সর্বাধুনিক যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড (সিভিএন-৭৮)। তবে টানা এই মিশন শেষে জাহাজটি দীর্ঘমেয়াদী মেরামতের মুখে পড়তে যাচ্ছে।
ইরান যুদ্ধে জাহাজটির মূল লন্ড্রি এলাকায় লাগা একটি অগ্নিকাণ্ডে বেশ কয়েকজন নাবিক আহত হন এবং থাকার জায়গা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কয়েক ঘণ্টার বিরামহীন চেষ্টার পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হলেও— সুবিশাল রণতরীটি এখন পুরোপুরি মেরামতের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
সমুদ্রবক্ষে প্রায় এক বছর অতিবাহিত করার পর—যা সাম্প্রতিক নৌ-ইতিহাসের দীর্ঘতম এবং অত্যন্ত কঠিন মোতায়েনগুলোর মধ্যে একটি—এখন এই রণতরীটি দীর্ঘস্থায়ী রক্ষণাবেক্ষণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা জোরালো হচ্ছে।
দীর্ঘ সময় মোতায়েন থাকার ধকল, অগ্নিকাণ্ডের ক্ষয়ক্ষতি এবং জমে থাকা রক্ষণাবেক্ষণ কাজ—সব মিলিয়ে রণতরীটি দীর্ঘ সময়ের জন্য কার্যক্রমের বাইরে থাকতে পারে। ধারণা করা হচ্ছে, এই মেরামতের সময়সীমা ১২ থেকে ১৪ মাস পর্যন্ত হতে পারে।
এমন এক সময়ে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যখন মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে মার্কিন নৌবাহিনী বিমানবাহী রণতরীর প্রাপ্যতা নিয়ে এমনিতেই প্রচণ্ড চাপের মুখে রয়েছে। এই অবস্থায় নৌবাহিনীর সবচেয়ে উন্নত এই প্ল্যাটফর্মটি দীর্ঘ সময়ের জন্য সার্ভিসে অনুপস্থিত থাকা— বড় ধরনের কৌশলগত সংকটের কারণ হতে পারে।
ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড ও এর ভূমিকা
ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড হলো মার্কিন নৌবাহিনীর 'ফোর্ড-ক্লাস' এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার সিরিজের প্রধান জাহাজ। মূলত পুরনো নিমিৎজ শ্রেণির রণতরীগুলোকে প্রতিস্থাপন এবং মার্কিন নৌ-অ্যাভিয়েশনের ভবিষ্যৎ সক্ষমতা বাড়াতে এই আধুনিক নকশার জাহাজটি তৈরি করা হয়েছে।
২০১৭ সালে কমিশন লাভ করা প্রায় ১ লাখ টন ওজনের এই পরমাণু শক্তিচালিত রণতরীটি ৭৫টিরও বেশি যুদ্ধবিমান এবং ৫ হাজারেরও বেশি নাবিক, নৌসেনা ও অন্যান্য সহায়ক কর্মী বহনে সক্ষম।
জাহাজটিতে ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক এয়ারক্রাফট লঞ্চ সিস্টেম (ইমলস) এবং অ্যাডভান্সড অ্যারেস্টিং গিয়ার-এর মতো যুগান্তকারী প্রযুক্তিগত পরিবর্তন আনা হয়েছে। এগুলো পুরনো সিস্টেমের তুলনায় দ্রুততর যুদ্ধবিমান উৎক্ষেপণ এবং কম জনবল দিয়েও পরিচালনার লক্ষ্যে তৈরি করা হয়েছে।
এই উদ্ভাবনগুলো মার্কিন নৌবাহিনীর দীর্ঘমেয়াদী রণতরী কৌশলের মূল ভিত্তি হলেও— জাহাজটি সার্ভিসে আসার পর থেকেই কিছু কারিগরি জটিলতা এবং নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।
জেরাল্ড আর ফোর্ডের মতো একটি জাহাজের দীর্ঘ সময় অকেজো থাকা কোনোভাবেই কাম্য নয়। যেহেতু এটি এই সিরিজের প্রথম জাহাজ, তাই এর দীর্ঘস্থায়ী মেরামত প্রক্রিয়া পুরো 'ফোর্ড-ক্লাস' জাহাজের ওপর আস্থার ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ইরান যুদ্ধে কঠিন মোতায়েনের ভার
মোতায়েনকালে ফোর্ডকে অত্যন্ত প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। শুরুতে ক্যারিবীয় অঞ্চলে কার্যক্রম পরিচালনা করলেও পরে এটিকে জরুরি ভিত্তিতে মধ্যপ্রাচ্যে সরিয়ে নেওয়া হয়, যেখানে এটি ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন অভিযানে কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে।
চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে এই অভিযানের অংশ হিসেবে মার্কিন বাহিনী ইরানে ৭ হাজারেরও বেশি হামলা চালিয়েছে। এসব অভিযানে বিমান হামলা পরিচালনা এবং এই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখতে ফোর্ড প্রধান ভূমিকা রেখেছে।
এটি কোনো সাধারণ মোতায়েন ছিল না। জাহাজটিকে নিয়মিত উচ্চমাত্রায় বিমান অভিযান পরিচালনা করতে হয়েছে এবং অত্যন্ত উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে নিরবচ্ছিন্ন চাপ সহ্য করে কাজ চালিয়ে যেতে হয়েছে।
এই মোতায়েনের সময়সীমা কয়েক দফা বাড়ানো হয়েছে, যা জাহাজটিকে আধুনিক নৌ-ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘতম মোতায়েনের রেকর্ডের দিকে নিয়ে গেছে।
দীর্ঘ সময় রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়া কাজ করায়— জাহাজের যান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং বিশেষ করে প্লাম্বিং সিস্টেমের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়েছে। সেই সঙ্গে নাবিকদের ক্লান্তি এবং যন্ত্রপাতির অস্বাভাবিক ক্ষয় জাহাজটির সক্ষমতার ওপর বড় দাগ ফেলেছে।
সহজ কথায়, ফোর্ড এমন মাত্রায় কাজ করেছে যা এর যান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং কর্মীদের স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা দ্রুত কমিয়ে দিচ্ছে।
অগ্নিকাণ্ড এবং জরুরি মেরামতের প্রয়োজনীয়তা
জাহাজটিকে অভিযান থেকে সরিয়ে জরুরি মেরামতে পাঠাতে বাধ্য করার মূল কারণ ছিল গত ১২ মার্চের অগ্নিকাণ্ড। এটি জাহাজের লন্ড্রি বিভাগ থেকে শুরু হয়ে দ্রুত পার্শ্ববর্তী জায়গাগুলোতেও ছড়িয়ে পড়েছিল।
এই দুর্ঘটনায় নাবিকদের থাকার প্রায় ১০০টি বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ধোঁয়ার কারণে অসুস্থ হয়ে পড়া প্রায় ২০০ জন নাবিককে চিকিৎসা দিতে হয়। অন্তত একজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য জরুরি ভিত্তিতে সরিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনও পড়েছিল।
যদিও মার্কিন নৌবাহিনী নিশ্চিত করেছে যে জাহাজের প্রপালশন সিস্টেম বা মূল ইঞ্জিন ব্যবস্থা অক্ষত রয়েছে, তবে ঘটনার ভয়াবহতা জাহাজটির সার্বিক অবস্থা নিয়ে নতুন করে ভাবাতে বাধ্য করছে।
ফলে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে বড় ধরনের মেরামতের পেছনে কেবল অগ্নিকাণ্ডই একমাত্র কারণ নয়; বরং এটি ছিল 'শেষ ধাক্কা'। কারণ মাসের পর মাস বিরামহীন অভিযান এবং আগে থেকে বিদ্যমান যান্ত্রিক সমস্যাগুলো মেরামতের সুযোগ না পাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
মেরামত কি সত্যিই ১৪ মাস সময় নেবে?
স্বাভাবিক অবস্থায় একটি পরমাণু শক্তিচালিত বিমানবাহী রণতরী মোতায়েন শেষে মেরামতে বেশ কয়েক মাস সময় লাগে, এমনকি যদি বড় কোনো ক্ষতি নাও হয় তাহলেও।
আগের মেরামতকালীন অভিজ্ঞতাগুলো বলছে যে, জটিল ওভারহল বা বড় কোনো মেরামতের ক্ষেত্রে এই সময়সীমা এক বছর অনায়াসেই ছাড়িয়ে যেতে পারে।
ফোর্ডের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় ইঙ্গিত দিচ্ছে যে এই সময়সীমা দীর্ঘ হবে। প্রথমত, এটি এই শ্রেণির প্রথম জাহাজ হওয়ায় এর রক্ষণাবেক্ষণ প্রক্রিয়া সাধারণ জাহাজের চেয়ে অনেক বেশি জটিল।
দ্বিতীয়ত, দীর্ঘ মোতায়েনের কারণে জমে থাকা অসংখ্য রক্ষণাবেক্ষণের কাজ এখন একসাথে করতে হবে। তৃতীয়ত, অগ্নিকাণ্ডের ফলে জাহাজের কাঠামো এবং কর্মীদের আবাসন ব্যবস্থার যে ক্ষতি হয়েছে, তা মেরামত করা সাধারণ প্রকৌশল কাজের চেয়ে অনেক বেশি সময়সাপেক্ষ।
সব মিলিয়ে ১২ থেকে ১৪ মাসের জন্য ফোর্ড অকেজো থাকার বিষয়টি এখন অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত বলে মনে হচ্ছে। দীর্ঘ মেয়াদী মোতায়েনের জন্য সম্ভবত এই বিশাল মূল্যই দিতে হচ্ছে মার্কিন নৌবাহিনীকে।
