ওয়াশিংটনে ইসরায়েল-লেবানন বৈঠক: ইসরায়েল চায় হিজবুল্লাহর পতন, লেবানন চায় যুদ্ধবিরতি
কয়েক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো ইসরায়েল ও লেবাননের মধ্যে সরাসরি আলোচনা অনুষ্ঠিত হলো। মঙ্গলবার (১৪ এপ্রিল) এই বৈঠকের আয়োজন করেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও।
বৈঠক শেষে দুই পক্ষই জানিয়েছে, তাদের মধ্যে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে। তবে শান্তির কোনো রূপরেখায় তারা একমত হয়েছে কি না, তা তাৎক্ষণিকভাবে পরিষ্কার হয়নি।
১৯৪৮ সালে ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার পর থেকেই দেশ দুটি কাগজে-কলমে যুদ্ধাবস্থায় রয়েছে। এর মধ্যে দুই দেশের প্রতিনিধিদের এমন সাক্ষাৎ খুবই বিরল ঘটনা। তবে তারা ভিন্ন ভিন্ন দাবি নিয়ে এই আলোচনায় বসেছিলেন। ইসরায়েল লেবাননে যুদ্ধবিরতির বিষয়টি নাকচ করে দিয়েছে এবং হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার দাবি জানিয়েছে।
বৈঠক শেষে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক বিবৃতিতে দুই দেশের অবস্থান তুলে ধরা হলেও তারা কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পেরেছে কি না, তা বলা হয়নি। তবে এতে উল্লেখ করা হয়, 'পারস্পরিক সম্মত সময় ও স্থানে সরাসরি আলোচনা শুরু করতে সব পক্ষই রাজি হয়েছে।'
ওয়াশিংটনে দুই ঘণ্টার বেশি সময় ধরে চলা এই বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূত ইয়েচিয়েল লেইটার। তিনি বলেন, ইরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর 'দখলে' লেবানন আর থাকবে না—বৈঠকে বিষয়টি পরিষ্কার করেছে দেশটির সরকার।
তবে ইসরায়েল লেবাননে হামলা বন্ধ করবে কি না, সে বিষয়ে তিনি কিছু বলতে রাজি হননি।
অন্যদিকে লেবাননের রাষ্ট্রদূত নাদা মোয়ায়াদ এই প্রাথমিক বৈঠকটিকে 'গঠনমূলক' বলে উল্লেখ করেছেন। বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি জানান, বৈঠকে তিনি যুদ্ধবিরতি এবং বাস্তুচ্যুত মানুষদের নিজ বাড়িতে ফেরানোর দাবি জানিয়েছেন।
একই সঙ্গে সংঘাতের কারণে লেবাননে তৈরি হওয়া মানবিক সংকট কমানোর পদক্ষেপ নেওয়ারও আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চুক্তির এক সপ্তাহের মাথায় বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হলো। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে এই অঞ্চলে বড় ধরনের সংঘাত শুরু হয়। তেহরানের সমর্থনে ২ মার্চ হামলা চালায় হিজবুল্লাহ। এর জেরে পাল্টা হামলা শুরু করে ইসরায়েল।
লেবানন কর্তৃপক্ষের তথ্য মতে, এই হামলায় ২ হাজারের বেশি মানুষ নিহত এবং ১২ লাখ মানুষ ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধবিরতি যেন ভেস্তে না যায়, সে জন্য লেবাননে হামলা কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন ট্রাম্প। মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাতের কারণে ইতিহাসে সবচেয়ে বড় তেল সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ফলে এই সংকট থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজতে ট্রাম্পের ওপর চাপ বাড়ছে।
মধ্যপ্রাচ্য সংকটে গুরুত্বপূর্ণ মোড়
বৈঠকের শুরুতে রুবিও স্বীকার করেন, মঙ্গলবারের এই আলোচনা সব জটিলতার সমাধান করবে না। তবে এটি শান্তির একটি রূপরেখা তৈরিতে সাহায্য করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
ইসরায়েলি রাষ্ট্রদূত লেইটার আশা প্রকাশ করে বলেন, 'লেবানন সরকার স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, তারা আর হিজবুল্লাহর দখলে থাকবে না, এটাই আমাকে আশা দেখাচ্ছে... এটি একটি বড় সুযোগ। তিন দশকের বেশি সময়ের মধ্যে এই প্রথম আমাদের দুই দেশ একসঙ্গে বসছে।'
আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আরও আলোচনা হতে পারে বলেও জানান তিনি।
প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন ও প্রধানমন্ত্রী নওয়াফ সালামের নেতৃত্বাধীন লেবানন সরকার হিজবুল্লাহর আপত্তি সত্ত্বেও ইসরায়েলের সঙ্গে আলোচনার আহ্বান জানিয়েছে।
২০২৪ সালে হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলের মধ্যে যুদ্ধের পর থেকেই গোষ্ঠীটিকে শান্তিপূর্ণভাবে নিরস্ত্র করার চেষ্টা করছে লেবানন সরকার। জোরপূর্বক তাদের নিরস্ত্র করতে গেলে দেশটিতে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
উল্লেখ্য, ১৯৭৫ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত দেশটি গৃহযুদ্ধে বিপর্যস্ত ছিল। ২০০৮ সালেও পশ্চিমা-সমর্থিত সরকারের হিজবুল্লাহবিরোধী পদক্ষেপের কারণে দেশটিতে সংক্ষিপ্ত গৃহযুদ্ধ দেখা দেয়। তবে গত মাসে ইসরায়েলে হামলার পর হিজবুল্লাহর সামরিক শাখাকে নিষিদ্ধ করেছে বর্তমান সরকার।
এদিকে লেবাননের কর্মকর্তারা বলেছেন, মঙ্গলবারের বৈঠকে রাষ্ট্রদূত মোয়ায়াদের কেবল যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা করার এখতিয়ার রয়েছে। অন্যদিকে ইসরায়েলি সরকারের মুখপাত্র শোশ বেড্রোসিয়ান জানিয়েছেন, ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি নিয়ে কোনো আলোচনা করবে না। এটি কার্যত দুই পক্ষের মধ্যে চরম মতবিরোধকেই স্পষ্ট করে।
আরও আলোচনার সম্ভাবনা
পরবর্তীতে আরও আলোচনার বিষয়ে লেইটার বলেন, 'বেশ কয়েকটি প্রস্তাব ও সুপারিশ এসেছে। আমরা অবশ্যই এগুলো আমাদের সরকারকে জানাব... এবং আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আমরা আবারও একসঙ্গে বসব। সম্ভবত ওয়াশিংটনেই এই আলোচনা চলবে।'
তবে ইরানের সঙ্গে আলোচনায় সশরীরে উপস্থিত না থাকায় মঙ্গলবার রুবিওর এই বৈঠক আয়োজন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরান-যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় মার্কিন প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিতে গত সপ্তাহে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সকে ইসলামাবাদে পাঠান।
ভ্যান্স যখন পাকিস্তানে ঘোষণা দিচ্ছিলেন যে ইরানিদের সঙ্গে আলোচনা কোনো অগ্রগতি ছাড়াই শেষ হয়েছে, তখন রুবিও ফ্লোরিডায় ট্রাম্পের সঙ্গে বসে একটি 'মিক্সড মার্শাল আর্টস' অনুষ্ঠান উপভোগ করছিলেন।
