ইরানকে ঘিরে সর্বশেষ আঞ্চলিক যুদ্ধ যেভাবে বদলে দিচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি
মধ্যপ্রাচ্যের অগণিত যুদ্ধের মধ্যে, উপসাগরীয় যুদ্ধগুলোর মতো ব্যাপক প্রভাব অন্য সংঘাতগুলো কমই ফেলেছে। ১৯৯১ সালের প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধ শুরু হয় যখন সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর আমেরিকা একক পরাশক্তি হিসেবে সদ্যই আবির্ভুত হয়েছিল। একটি মিত্র জোট গঠনের মাধ্যমে আমেরিকা কুয়েত থেকে সাদ্দাম হোসেনের দখলদার সেনাবাহিনীকে বিতাড়িত করে। যুদ্ধের বেশিরভাগটা হয়েছিল আকাশপথেই, যেখানে আধিপত্য ছিল মিত্রশক্তির। অন্যদিকে স্থলপথে যুদ্ধ হয় মাত্র চারদিনের। মার্কিন বিমান হামলায় কুয়েত থেকে পালানোর পথে হাজার হাজার ইরাকি যানবাহনের পোড়া ভগ্নাবশেষ— ব্যাপক অসম আমেরিকান শক্তির বহিঃপ্রকাশ করে; যার নামই হয়ে যায় 'হাইওয়ে অব ডেথ' বা মৃত্যুর মহাসড়ক। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলো নিরাপত্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেয়।
দ্বিতীয় উপসাগরীয় যুদ্ধ, বা দ্বিতীয় ইরাক যুদ্ধ এমন সময়ে ঘটে যখন পরাশক্তি আমেরিকা আত্মসংশয়ে ভুগতে শুরু করছিল। এই যুদ্ধ ভিন্ন বাস্তবতা তৈরি করে। যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সাদ্দামের শাসন উৎখাত করলেও এরপর প্রায় এক দশক ধরে তারা ইরাকিদের তীব্র বিদ্রোহ মোকাবিলায় জড়িয়ে পড়ে। ইরাক যুদ্ধের সেই অভিজ্ঞতা এরপর থেকে আমেরিকার প্রতিটি সামরিক অভিযানের ওপর ছায়া ফেলেছে। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ আশা করেছিলেন, এই আক্রমণের ফলে মধ্যপ্রাচ্যে গণতন্ত্রের ঢেউ উঠবে। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছিল উল্টোটা—যুদ্ধের মাধ্যমে এই অঞ্চলে ইরানের প্রধান রাষ্ট্রীয় প্রতিদ্বন্দ্বীকে সরিয়ে দেওয়া হয়; ফলে ইরান তার মিত্রদের মাধ্যমে ইরাক, লেবানন ও ইয়েমেনে প্রভাব বিস্তার করে একটি নতুন আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
ফেব্রুয়ারি ২৮ তারিখে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী হামলা দিয়ে যে যুদ্ধ শুরু হয়েছে, সেটিকে যথার্থই তৃতীয় উপসাগরীয় যুদ্ধ বলা যায়। ইতোমধ্যে পারস্য উপসাগরঘেঁষা আটটি দেশসহ আরও অন্তত অর্ধডজন দেশ এতে জড়িয়ে পড়েছে। যুদ্ধের শুরুর ঘটনাগুলো ছিল নাটকীয়। সংঘাতের শুরুতেই ইসরায়েলি বিমান হামলায় নিহত হন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। এরপর উপসাগরের সাধারণত শান্ত শহরগুলোতে ইরানি ড্রোনের হামলা শুরু হয়। একই সঙ্গে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম দ্রুত বেড়ে যায়।
মার্কিন অনেক কর্মকর্তা মনে করছেন, লড়াই কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত চলতে পারে। কিন্তু, যুদ্ধের শেষ কীভাবে হবে তা অনুমান করা কঠিন—কারণ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের লক্ষ্য প্রায়ই পরিবর্তিত হচ্ছে। তবে যুদ্ধ যেভাবেই শেষ হোক না কেন, তৃতীয় উপসাগরীয় যুদ্ধও তার আগের দুটি যুদ্ধের মতোই মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য বদলে দেবে। ইরান দুর্বল হয়ে পড়বে। উপসাগরীয় দেশগুলোকে তাদের নতুন দুর্বলতার বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে তাদের এমন এক দুর্বল কিন্তু স্থায়ী হুমকির মোকাবিলা করতে হতে পারে—যেমনটি কুয়েত যুদ্ধের পরবর্তী দশকে ইরাক ছিল।
চড়া মানবিক মূল্য
ওয়াশিংটনভিত্তিক একটি ইরানি মানবাধিকার সংস্থা জানায়, ইতোমধ্যে দেশটিতে ১,১১৪ জন বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ১৮০ জনের বেশি শিশু। সামরিক বাহিনীর সদস্যদের নিহতের সংখ্যা এখনো অজানা। ইসরায়েল ধারাবাহিকভাবে এমন কিছু লক্ষ্যভিত্তিক হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে, যার উদ্দেশ্য ছিল ইরানের শাসনব্যবস্থার নেতৃত্বকে অকার্যকর করে দেওয়া। খামেনির পাশাপাশি আরও কয়েক ডজন শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হয়েছে বলে জানা গেছে—যাদের মধ্যে প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) প্রধানও রয়েছেন।
ইরানের ৯ কোটি ২০ লাখ মানুষের মতামত সম্পর্কে এককভাবে কিছু বলা কঠিন। দেশটি সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে বৈচিত্র্যময়। খামেনি নিহত হওয়ার রাতে কোথাও উদযাপন হয়েছে, আবার পরদিন দেখা গেছে শোকের দৃশ্য। কিছু বিরোধীমতের একটিভিস্ট বলছেন, শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে যুদ্ধকে শুরুতে সমর্থন করা অনেক ইরানি ইতোমধ্যেই ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন—কারণ এক সপ্তাহ ধরে চলা বোমাবর্ষণের শেষ এখনো দেখা যাচ্ছে না।
এই ভিন্নমুখী মতামতগুলোর প্রতিফলন দেখা গেছে তুরস্কের সীমান্তবর্তী কাপিকয় এলাকায়। জেসমিন নামে এক নারী ও তার সঙ্গী ১ মার্চ তেহরান থেকে তুরস্কগামী একটি যাত্রীবাহী ট্রেনে ওঠেন। ট্রেনটি সীমান্ত থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরের তাবরিজ পর্যন্ত পৌঁছানোর পর থেমে যায়। তিনি সাত ঘণ্টা ট্রেনে অপেক্ষা করেন, পরে ট্যাক্সিতে করে যাত্রা চালিয়ে যান। তুরস্কের সীমান্তে তুষারঢাকা পাহাড়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে তিনি তেহরানের চারপাশে বিমান হামলার শব্দের কথা স্মরণ করেন। চোখে জল নিয়ে বলেন, "ভয়াবহ ছিল। আমি শুধু একটি স্বাভাবিক দেশ চাই।"
আরেক নারী বলেন, তিনি শিগগিরই ফিরে যাওয়ার আশা করছেন। "আমি নিশ্চিত, এক মাসের মধ্যেই স্বাধীনতা উদযাপন করতে ফিরে আসব," বলেন তিনি। অন্যদিকে কিছু মানুষ ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন। তুরস্কে সংক্ষিপ্ত সফর শেষে বাড়ি ফিরতি এক ইরানি দোকানদার বলেন, "আমেরিকা ও ইসরায়েল যা করছে, সেজন্য তাদের মূল্য দিতে হবে।"
ইরানের শাসকগোষ্ঠী অবশ্য স্থিতিশীলতার বার্তা দিতে আগ্রহী। খামেনির মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সংবিধান অনুযায়ী, দেশ পরিচালনার জন্য তিন সদস্যের একটি পরিষদ গঠন করা হয়। ইসরায়েলি হামলায় নিহত কর্মকর্তাদের কিছু পদে দ্রুত নতুন নিয়োগও দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনী রাস্তায় মোতায়েন করা হয়েছে, যাতে ট্রাম্পের আহ্বানে কেউ "সরকার দখল" করার আন্দোলনে নামতে না পারে। ৮৮ জন ধর্মীয় নেতার সমন্বয়ে গঠিত অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের আলোচনা শুরু করেছে।
সর্বশেষ পাওয়া খবর অনুযায়ী, ইরানের পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিশেষ কমিটি তাদের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করেছে। কমিটির সদস্যরা জানিয়েছেন যে, তারা একজন উত্তরসূরি মনোনীত করেছেন, তবে তার নাম এখনো জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি।
এখনো নাম ঘোষণা করা না হলেও নিহত খামেনির দ্বিতীয় ছেলে মোজতবা খামেনির নাম সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে ঘুরছে। এটি একটি তাৎপর্যপূর্ণ ইঙ্গিত হতে পারে। তাঁর বাবা আলী খামেনি দীর্ঘ অর্থনৈতিক সংকট, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন ও ব্যর্থ বৈদেশিক নীতির জন্য দেশে ব্যাপকভাবে অজনপ্রিয় ছিলেন। তার ছেলে কখনো রাষ্ট্রীয় পদে ছিলেন না এবং জনসমক্ষে তার তেমন পরিচিতিও নেই; ধর্মীয় মর্যাদাতেও তিনি একজন মধ্যম পর্যায়ের আলেম মাত্র। এমনকি শাসনগোষ্ঠীর অনেক সমর্থকও বংশগত নেতৃত্ব মেনে নিতে দ্বিধা করতে পারেন— এই ভেবে যে, ১৯৭৯ সালে তারা রাজতন্ত্র উৎখাত করেছিলেন কি আরেকটি রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য?
তবে এসবের ঘাটতি থাকলেও মোজতবা খামেনির পেছনে শক্তিশালী সমর্থন রয়েছে। তিনি বহু বছর বাবার সহকারী হিসেবে কাজ করেছেন এবং আইআরজিসির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন। তাকে নির্বাচিত করা হলে তা ধারাবাহিকতার ইঙ্গিত দেবে। ক্ষমতার কেন্দ্র হিসেবে রেভল্যুশনারি গার্ডই থাকবে।
সামরিক বাস্তবতা
বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ায় ইরানের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধবিমান প্রতিহত করা কঠিন হয়ে গেছে। এখন পর্যন্ত তারা একটি বিমানও ভূপাতিত করতে পারেনি বলে পশ্চিমা সূত্রের দাবি; বিপরীতে ইসরায়েল ও কাতার উভয়ই ইরানি যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করেছে। ফলে ইরান মূলত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ওপর নির্ভর করছে—যার লক্ষ্য ইসরায়েল, উপসাগরীয় দেশ এবং অন্যান্য স্থাপনা। তবে কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় কিছু দুর্বলতার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। অঞ্চলের গোয়েন্দা সূত্র বলছে, ইরানি শাসকগোষ্ঠী অনেক ক্ষেত্রে কমান্ডারদের নিজস্ব লক্ষ্য নির্বাচন করার স্বাধীনতা দিয়েছে।
ইতোমধ্যে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার গতি কমে যাওয়ার লক্ষণও দেখা যাচ্ছে। যুদ্ধের প্রথম দিনে তারা ইসরায়েলে প্রায় ১৮০টি এবং উপসাগরীয় অঞ্চলে ২৫০টি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে। কিন্তু চতুর্থ দিনে সেই সংখ্যা কয়েক ডজনের মধ্যে নেমে আসে। এর কয়েকটি সম্ভাব্য কারণ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা ধ্বংসের চেষ্টা করছে। পাশাপাশি ইরান হয়তো তাদের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সংরক্ষণ করছে—যাতে প্রতিপক্ষের প্রতিহতকারী (ইন্টারসেপ্টর) ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার কমে গেলে বড় আকারের হামলা চালানো যায়।
জ্বালানির বাজারে আগুন
উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) ছয়টি দেশই বিপুল তেল, গ্যাস মজুতের অধিকারী। প্রতিটি দেশেই শাসনক্ষমতা রাজতন্ত্রের হাতে। বর্তমানে এসব দেশই ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলার সবচেয়ে বড় চাপ বহন করছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, মাত্র চার দিনে তাদের ওপর ১৮৯টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ৯৪১টি ড্রোন হামলা হয়েছে। বাহরাইন, কুয়েত ও কাতারও শতাধিক হামলার কথা জানিয়েছে। অবশ্য্য ওমান ও সৌদি আরবে হামলার সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম।
সংযুক্ত আরব আমিরাত দাবি করেছে, দেশটির দিকে ছুটে আসা ৯৩ শতাংশ প্রজেক্টাইল (ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন) ভূপাতিত করেছে। অন্য উপসাগরীয় দেশগুলো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ না করলেও আরব ও পশ্চিমা কর্মকর্তারা বলছেন, তারাও তুলনামূলক ভালোভাবে হামলা প্রতিহত করতে পেরেছে। প্রতিরোধকারী ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত গোপন রাখা হয়, তবে অঞ্চলের দুটি সামরিক সূত্র বলছে, বর্তমান হারে ইরানের হামলা চললে তারা কয়েক সপ্তাহ যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবে।
তবুও খরচ বাড়ছে দ্রুত। উপসাগরীয় দেশগুলোয় অন্তত সাতজন নিহত এবং বহু মানুষ আহত হয়েছেন। এসব দেশে অবস্থিত বিশ্বের ব্যস্ততম বিমান চলাচল কেন্দ্রগুলোর কয়েকটিতে হাজার হাজার ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। ইরান হরমুজ প্রণালি "বন্ধ" ঘোষণা করার পর এবং তেল-গ্যাস স্থাপনা ও ট্যাংকারে হামলা চালানোর ফলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। শুধু আকাশ প্রতিরক্ষার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের খরচই ইতোমধ্যে কয়েক বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
তবে সবচেয়ে উদ্বেগজনক ক্ষতি সম্ভবত সেইটি, যার হিসাব করা কঠিন। দীর্ঘদিন ধরে উপসাগরীয় দেশগুলো নিজেদের নিরাপদ ও স্থিতিশীল অঞ্চল হিসেবে তুলে ধরে— ধনী প্রবাসীদের আকর্ষণের কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাত মধ্যপ্রাচ্যের নানা সংঘাত থেকে পালিয়ে আসা আরবদের পাশাপাশি ইউরোপীয়দেরও আকৃষ্ট করেছে। রাশিয়া যখন ইউক্রেনে হামলা চালায়, তখন রুশ ও ইউক্রেনীয় উভয় দেশের অনেকে দুবাইয়ে আশ্রয় নেন। এভাবে বিশ্বের অন্য কোথাও অস্থিরতা তৈরি হলে তা প্রায়ই উপসাগরীয় অঞ্চলের জন্য সুখবর বয়ে আনত।
এবার কিন্তু দুঃসংবাদ নিজ বাড়িতে এসে পৌঁছেছে। ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলের অনেক ভিনদেশী বাসিন্দা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। কেউ কেউ হাজার হাজার ডলার খরচ করে রিয়াদ বা মাসকাটে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন, যেখানে বিমানবন্দর এখনো চালু আছে। এমন একটি অঞ্চলে, যেখানে বছরের অধিকাংশ সময় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ছাড়া থাকা যায় না এবং প্রাকৃতিক পানির উৎস সীমিত—সেখানে বিদ্যুৎকেন্দ্র বা ডিস্যালিনেশন প্ল্যান্টে সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
কৌশলগত হিসাব
ইরানি শাসকগোষ্ঠী আশা করছে, এসব আতঙ্ক উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলোকে ট্রাম্পের ওপর যুদ্ধবিরতির চাপ দিতে বাধ্য করবে। কারণ যুদ্ধের আগে দুই মাস ধরে তারা ট্রাম্পকে হামলা না করার অনুরোধ জানিয়েছিল। কিন্তু, বাস্তবে তারা ইরানের প্রত্যাশার চেয়ে বেশি দৃঢ়তা দেখিয়েছে। সৌদি আরব তার তেল শোধনাগার ও রিয়াদের মার্কিন দূতাবাস এলাকায় হামলায় ক্ষুব্ধ। দেশটি ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন স্থাপনায় সরাসরি হামলায় যোগ দেবে কি না—এ নিয়ে প্রকাশ্য আলোচনাও চলছে। একই ধরনের আলোচনা হচ্ছে সংযুক্ত আরব আমিরাতেও। এমনকি ইরানের সঙ্গে যৌথ গ্যাসক্ষেত্র থাকা এবং তুলনামূলক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করা কাতারও এখন কঠোর ভাষায় কথা বলছে।
উপসাগরীয় শাসকরা প্রকাশ্যে না বললেও ব্যক্তিগতভাবে ট্রাম্পকে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পরামর্শ দিচ্ছেন। তাদের মতে, এখন যুদ্ধ থামিয়ে দিলে পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হতে পারে। সে ক্ষেত্রে তাদের সীমান্তের পাশে একটি আহত কিন্তু শত্রুভাবাপন্ন ইরানি শাসনব্যবস্থা টিকে থাকবে। তাছাড়া ইরান একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পেয়ে যাবে যে—জিসিসি দেশগুলোতে হামলা চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের আচরণ বদলানো সম্ভব। ফলে ভবিষ্যতে আরেকটি যুদ্ধ হলে তেহরান হয়তো আরও দ্রুত ও বড় পরিসরে প্রতিবেশীদের ওপর হামলা চালাবে।
তবে ট্রাম্প এসব পরামর্শ শুনবেন কি না তা বলা কঠিন। তিনি একদিকে বলেন, ইরানের জনগণের জন্য "স্বাধীনতা" চান, আবার অন্যদিকে শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে আলোচনা করে সমঝোতা করতে চান। কখনো তিনি বলেন যুদ্ধ দুই-তিন দিনের মধ্যেই শেষ হবে, আবার কখনো বলছেন চার-পাঁচ সপ্তাহ চলতে পারে। কখনো কখনো একই দিনে তিনি এই সব বক্তব্যই দেন।
তার সহযোগীরা অবশ্য লক্ষ্য নির্ধারণে কিছুটা নির্দিষ্ট হওয়ার চেষ্টা করেছেন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, তাদের উদ্দেশ্য হলো ইরানের ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি ও নৌবাহিনী ধ্বংস করা। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এর সঙ্গে ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতাও যুক্ত করেছেন। আমেরিকার সামরিক কর্মকর্তারা ইতোমধ্যে অর্জনের তালিকা তুলে ধরছেন—যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিভিন্ন স্থানে দুই হাজারের বেশি হামলা চালিয়েছে, এক ডজনের বেশি নৌযান ডুবিয়েছে এবং ৪ মার্চ শ্রীলঙ্কার উপকূলে একটি ইরানি ফ্রিগেট সাবমেরিন থেকে টর্পেডো ছুড়ে ধ্বংস করা হয়েছে।
সম্ভবত ট্রাম্পের মূল লক্ষ্য হলো এমন একটি সমস্যার সমাধান দাবি করা, যা প্রায় ৫০ বছর ধরে প্রতিটি মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ভাবিয়েছে। ইসলামি প্রজাতন্ত্র দীর্ঘদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা ছড়িয়েছে—প্রক্সি মিলিশিয়াদের অস্ত্র ও সমর্থন দিয়ে। বারাক ওবামা ও জো বাইডেন ইরাক যুদ্ধের অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে সরাসরি যুদ্ধের বদলে আলোচনার পথ বেছে নিয়েছিলেন। এমনকি ট্রাম্প নিজেও তার প্রথম মেয়াদে সরাসরি ইরানে হামলা করতে দ্বিধা করেছিলেন—২০২০ সালে যখন তিনি ইরানি জেনারেল কাসেম সোলাইমানিকে হত্যার নির্দেশ দেন সেটাও ইরানের মাটিতে না করে, ইরাকে করা হয়।
নতুন বাস্তবতার প্রশ্ন
যুক্তরাষ্ট্র, ইরান, ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে সরাসরি সংঘাতের এই নতুন যুগে সবাইকে কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে। প্রথমেই তা করবে ইরান। দেশটির কিছু কট্টরপন্থী মনে করেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোর শিক্ষা হলো—ইসলামি প্রজাতন্ত্রকে উত্তর কোরিয়ার পথ অনুসরণ করতে হবে। খামেনি ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্রের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়েছিলেন, কিন্তু বোমা তৈরির নির্দেশ দেননি। তেহরানের কঠোরপন্থীরা মনে করেন, সেটিই ছিল তার মারাত্মক ভুল। ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা ঠেকাতে একমাত্র উপায় হলো পারমাণবিক অস্ত্র।
তবে "বেসমেন্টে বোমা" তৈরির কাজ ততটা সহজ নয়। ইসরায়েলি গোয়েন্দারা ইরানের বিভিন্ন স্তরে গভীরভাবে প্রবেশ করেছে—সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ একবার বলেছিলেন, ইসরায়েলি গুপ্তচর ধরার জন্য যে ইউনিট গঠন করা হয়েছিল তার প্রধানই পরে নিজে গুপ্তচর হিসেবে ধরা পড়ে। বাস্তববাদীরা হয়তো যুক্তি দেবেন, ইরানের উচিত ক্ষতি মেনে নিয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে সমঝোতা করা। তবে তারাও নিশ্চিত নন যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সেই চুক্তি মেনে চলবে।
উপসাগরীয় দেশগুলোকেও নিজেদের সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে। সামাজিক মাধ্যমে তাঁদের দুর্দশা দেখে অনেকের আত্মতুষ্টির উচ্ছ্বাস সত্ত্বেও—এই যুদ্ধ তাদের সুনাম পুরোপুরি ধ্বংস করবে—এমন সম্ভাবনা কম। দুবাইয়ের মতো শহর এখনো ব্যবসা ও পর্যটনের জন্য আকর্ষণীয়।
তবে তাদের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব আরও বেশি করে নিজেদের কাঁধে নিতে হবে। উপসাগরীয় আরব দেশগুলো বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করে আধুনিক অস্ত্র কিনলেও—যুদ্ধক্ষেত্রে তাদের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। রাজতন্ত্রগুলোর পারস্পরিক দ্বন্দ্ব আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সমন্বয়েও বাধা সৃষ্টি করেছে। ২০১৭ সালে তিনটি উপসাগরীয় দেশ কাতারের ওপর অবরোধ আরোপ করেছিল; ইরান যুদ্ধ শুরুর আগ পর্যন্ত সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের নেতারাও পরস্পরের সঙ্গে কথা বলতেন না।
ইরানে যাই ঘটুক না কেন, জিসিসিকে প্রতিরক্ষা থেকে জরুরি প্রস্তুতি—সব ক্ষেত্রেই নতুনভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। যদি ইরানি শাসনব্যবস্থা টিকে থাকে, তবে ড্রোন হামলা ও জাহাজ চলাচলে হামলার ঝুঁকি অব্যাহত থাকবে। আর যদি শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ে ও বিশৃঙ্খলা শুরু হয়, তবে ঝুঁকি আরও বাড়বে।
ইসরায়েলের জন্য এটি ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর চতুর্থ যুদ্ধ। ওই হামলায় প্রায় ১,২০০ মানুষ নিহত হয়েছিল। হামাস নেতা ইয়াহিয়া সিনওয়ার সেই হামলার মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের চেহারা বদলাতে চেয়েছিলেন—কিন্তু বর্তমান পরিবর্তন সম্ভবত তার কল্পনারও বাইরে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন প্রেসিডেন্টদের ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এখন সেই সুযোগ তার সামনে এসেছে। তার ডানপন্থী জোট সরকার এবং প্রায় সব বিরোধী দলই এই যুদ্ধে সমর্থন দিয়েছে। নেতানিয়াহু আশা করছেন, সফল অভিযান তাকে আবারও নির্বাচনে জয় এনে দেবে এবং তিনি দাবি করতে পারবেন যে তিনি "মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র বদলে দিয়েছেন"।
আগামী অক্টোবরের মধ্যে ইসরায়েলে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। যুদ্ধ শেষ হলে সেটি আগেভাগে আনা হতে পারে বলে তার দল লিকুদ পার্টির সূত্র জানিয়েছে। তবে পথ সহজ নাও হতে পারে। ইসরায়েলি ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজ ইনস্টিটিউটের এক জরিপ অনুযায়ী, ৮১ শতাংশ ইসরায়েলি হামলার সমর্থন করলেও মাত্র ৩৮ শতাংশ নেতানিয়াহুর ওপর উচ্চ আস্থা প্রকাশ করেছেন।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকেও শেষ পর্যন্ত যুদ্ধের সমাপ্তির পথ খুঁজতে হবে—এবং কোনো এক পর্যায়ে তাদের লক্ষ্য ভিন্ন হয়ে যেতে পারে। যতক্ষণ না ইরান পুরোপুরি ভেঙে পড়ছে—কিছু ইসরায়েলি হয়তো ততোদিন যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চাইবে। কিন্তু সেটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আরও বড় উদ্বেগের কারণ হতে পারে—কারণ এতে তেলের বাজার থেকে বৈশ্বিক শিপিং পর্যন্ত সবকিছুতে অস্থিরতা সৃষ্টি হবে। আবার ট্রাম্প যদি দ্রুত যুদ্ধ শেষ করতে চান, তাহলে নেতানিয়াহু ক্ষুব্ধ হতে পারেন।
এই সব দ্বিধা-দ্বন্দ্ব একে অপরের সঙ্গে জড়িত। দুর্বল কিন্তু শত্রুভাবাপন্ন একটি ইরান উপসাগরীয় দেশগুলোকে নিজেদের প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করতে এবং হয়তো ইসরায়েলের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ হতে উৎসাহিত করতে পারে। আর যদি ট্রাম্প খুব তাড়াতাড়ি যুদ্ধ শেষ করে দেন, তবে জিসিসি দেশগুলো তাদের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের ওপরই প্রশ্ন তুলতে পারে—যে ওয়াশিংটন তাদের আপত্তি সত্ত্বেও সংঘাতে টেনে এনে শেষ পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জনের আগেই থেমে গেছে।
প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধের পর উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের স্থায়ী সামরিক উপস্থিতি তৈরি হয়েছিল। সেই উপস্থিতিতে ক্ষুব্ধ হয়ে ওসামা বিন লাদেন নামের এক সৌদি তরুণ যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে হামলার ছক কষেন। এভাবে ইতিহাস প্রায়ই দেখায়—একটি যুদ্ধের সমাপ্তিই কখনো কখনো পরবর্তী সংঘাতের বীজ বুনে দেয়।
