‘দুবাইয়ের দুঃস্বপ্ন’: ইরানি হামলায় লন্ডভন্ড আরব আমিরাতের বাণিজ্যিক কেন্দ্র
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আকস্মিক হামলার জবাবে শনিবার আরব উপসাগরজুড়ে ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। তবে এই হামলার শিকার হওয়া শহরগুলোর মধ্যে একটি শহর বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, আর সেটি হলো দুবাই।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) সাতটি আমিরাতের মধ্যে অন্যতম এই দুবাই হলো ওই অঞ্চলের আমোদ-প্রমোদ ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র, যেখানে বড় বড় সব ব্যবসায়িক চুক্তি সম্পন্ন ও উদযাপন করা হয়। কিন্তু শনিবার আকাশ থেকে নেমে আসা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের আঘাতে শহরটি কালো ধোঁয়া আর আগুনের শিখায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। এই হামলার গুরুত্ব কেবল ভূ-রাজনৈতিক নয়; বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও বাণিজ্যের 'মরুদ্যান' হিসেবে পরিচিত দুবাইয়ের অর্জিত সম্মানে বড় ধরণের আঘাত হেনেছে।
করোনা পরবর্তী সময়ে সম্পদের দাম বৃদ্ধি, ক্রিপ্টোকারেন্সি এবং রিমোট ওয়ার্ক বা দূরবর্তী কাজের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বিশ্বের অন্য যেকোনো শহরের তুলনায় দুবাই অনেক বেশি লাভবান হয়েছিল। এখানকার নামমাত্র কর ব্যবস্থা এবং সহজ আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার আকর্ষণে লন্ডনের ব্যাংকার থেকে শুরু করে আমেরিকার 'ফিন্যান্স ব্রো'—সবার কাছেই শহরটি এক চুম্বকে পরিণত হয়। এখানকার আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো স্বর্ণের কারবার করা সুদানি মিলিশিয়া নেতা থেকে শুরু করে পূর্ব ইউরোপের যুদ্ধ এড়াতে পালিয়ে আসা রুশ ও ইউক্রেনীয় প্রবাসীদের নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত হয়েছিল।
দীর্ঘ যুদ্ধে কি দুবাইয়ের আবাসন খাতের ভবিষ্যৎ বদলে যাবে?
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ শুরু হলে ছোট-বড় সব বিনিয়োগকারীই এখানে বিনিয়োগের আগে দ্বিতীয়বার চিন্তা করবেন। শনিবার দুবাইয়ের অন্যতম প্রতীকী ছবি ছিল পাঁচ তারকা 'ফেয়ারমন্ট হোটেল' প্রাঙ্গণে জ্বলতে থাকা আগুন। যদিও বলা হচ্ছে যে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ধ্বংসাবশেষ থেকে এই আগুন লেগেছে, তবে একাধিক ভিডিও ফুটেজ ইঙ্গিত দিচ্ছে যে এটি একটি ইরানি ড্রোনের সরাসরি আঘাত হতে পারে। দুবাইয়ের 'পাম জুমেইরাহ' এলাকায় একটি ড্রোনের আছড়ে পড়ার দৃশ্যটি প্রতিবেশী দেশ বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তরে ড্রোন হামলার দৃশ্যের সঙ্গে হুবহু মিলে গেছে। একটি বারান্দা থেকে ধারণ করা পৃথক ভিডিওতে ড্রোনটিকে সরাসরি ফেয়ারমন্ট হোটেলে আঘাত হানতে দেখা গেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একজন মন্তব্যকারী লিখেছেন, "এই ছবি বা দৃশ্যটি ইতিমধ্যে সেই সব প্রবাসীদের প্রতিটি গ্রুপ চ্যাট, বোর্ডরুম এবং পারিবারিক হোয়াটসঅ্যাপ থ্রেডে ছড়িয়ে পড়েছে, যারা সিঙ্গাপুর, লন্ডন বা জুরিখের চেয়ে আরব আমিরাতকে বেছে নিয়েছিলেন। আধুনিক দুবাই যে হিসাব-নিকাশের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল, শোবার ঘরের জানালা দিয়ে দিগন্তজুড়ে আগুন দেখে সেই হিসাবটি এখন রিয়েল টাইমে বদলে যাচ্ছে।"
ইরানি হামলায় দুবাই পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়নি সত্য, তবে এই ফলফল এটাই প্রমাণ করেছে যে মধ্যপ্রাচ্যের অনিশ্চিত রাজনীতি থেকে দুবাই মোটেও বিচ্ছিন্ন নয়। এটি সম্পদের দাম কমিয়ে দিতে পারে এবং অস্থির বিনিয়োগকারীদের পুনরায় ভাবতে বাধ্য করতে পারে। ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস-এর উপসাগরীয় বিষয়ক বিশেষজ্ঞ সিনজিয়া বিয়াঙ্কো এক্সে লিখেছেন, "এটি দুবাইয়ের জন্য চূড়ান্ত দুঃস্বপ্ন, কারণ এর অস্তিত্বই নির্ভর করত অশান্ত অঞ্চলের মধ্যে একটি নিরাপদ মরুদ্যান হওয়ার ওপর। এখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর পথ থাকলেও আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়া অসম্ভব হতে পারে।"
ইরানি হামলার মুখে আমিরাতি কর্মকর্তারা বিশ্বের উচ্চতম ভবন 'বুর্জ খলিফা' থেকে মানুষকে সরিয়ে নিতে বাধ্য হন। অন্যদিকে, বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত বিমানবন্দর হিসেবে পরিচিত 'আল মাকতুম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর' অনির্দিষ্টকালের জন্য সব ফ্লাইট স্থগিত করেছে।
দুবাইয়ের এই রমরমা ব্যবসার অংশ পেতে প্রতিবেশী দোহা (কাতার), রিয়াদ (সৌদি আরব) ও মাসকাট (ওমান) নিজেদের আলাদাভাবে তুলে ধরার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত ছিল। এমনকি সিরিয়া, মিশর ও জর্ডানের মতো তুলনামূলক দরিদ্র দেশগুলোর কর্মকর্তারাও সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে দুবাইকে তাদের উন্নয়নের মডেল হিসেবে উল্লেখ করতেন। তবে ইরানের এই হামলাগুলো স্পষ্ট করে দিয়েছে যে এই অঞ্চলের যেকোনো 'বিজনেস বাবল' বা বাণিজ্যিক বুদবুদ আসলে ইসরায়েল ও মার্কিন নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্তের ওপর কতটা নির্ভরশীল।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শনিবার প্রকাশিত এক ভিডিও বার্তায় ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধকে একটি 'শাসন ব্যবস্থা পরিবর্তনের' অপারেশন হিসেবে বর্ণনা করেছেন। দুবাইয়ের আশপাশের কিছু বন্দরে মার্কিন নৌবাহিনীর যাতায়াত থাকলেও শহরটির খুব কাছে বড় কোনো মার্কিন সামরিক ঘাঁটি নেই। ফলে ধারণা করা হচ্ছে, ইরান দুবাইকে লক্ষ্যবস্তু করেছে কেবল এটি একটি বাণিজ্যিক কেন্দ্র হওয়ার কারণে।
একজন উপসাগরীয় কর্মকর্তা চলতি সপ্তাহে 'মিডল ইস্ট আই'-কে বলেছিলেন যে ইরানের সঙ্গে ভৌগোলিক ঘনিষ্ঠতা এবং ইসরায়েলের সাথে আবু ধাবির বন্ধুত্বের কারণে তাদের নেতৃত্ব আগেই ধারণা করেছিলেন যে আরব আমিরাত ইরানের তীব্র আগুনের মুখে পড়তে পারে। ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় 'আব্রাহাম অ্যাকর্ডস'-এর মাধ্যমে সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার পর থেকে আমিরাত ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠতম আরব অংশীদার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
ইরান কি উপসাগরীয় দেশগুলোকে মার্কিন যুদ্ধে যোগ দেওয়ার সুযোগ করে দিল?
দুবাই থেকে মাত্র ১৪০ কিলোমিটার দূরে আমিরাতের রাজধানী আবু ধাবির কাছেই অবস্থিত মার্কিন বাহিনীর 'আল ধাফরা বিমান ঘাঁটি'। বাহরাইনের রাজধানী মানামার ভেতরেই অবস্থিত মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তরও আক্রান্ত হয়েছে। একইভাবে কাতারও ইরানের আক্রমণের শিকার হয়েছে।
একই সময়ে উপসাগরজুড়ে ইরানের এই হামলা ওই অঞ্চলের নেতাদের ঐক্যবদ্ধ করেছে, যারা আগে সুদান, ইয়েমেন এবং গাজা ইস্যুতে একে অপরের বিরোধী অবস্থানে ছিলেন। সৌদি ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান শনিবার আমিরাতের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন জায়েদের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন এবং আমিরাতের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন।
পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে হামলা চালিয়ে ইরান সম্ভবত আরব রাজতন্ত্রগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের এই যুদ্ধে সমর্থন দেওয়ার একটি অজুহাত তৈরি করে দিচ্ছে। ইউরেশিয়া গ্রুপের ফিরাস মাকসাদ এক্সে লিখেছেন, "ইরান জিসিসি (উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ) দেশগুলোকে সংঘাত বৃদ্ধির সিঁড়িতে উঠতে বাধ্য করছে। এখন তাদের প্রতিক্রিয়া জানানোর কথা ভাবতে হবে অথবা অন্তত মার্কিন বাহিনীকে তাদের ভূখণ্ড থেকে আক্রমণাত্মক অভিযান চালানোর আরও বেশি স্বাধীনতা দিতে হবে।"
অন্যদিকে, ইরানের হিসাব হয়তো ভিন্ন। তারা সম্ভবত ভাবছে যে উপসাগরীয় দেশগুলো যদি ইরানের হামলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়, তবে তারাই যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ সৃষ্টি করবে।
