‘বিক্ষোভ চালিয়ে যান, প্রতিষ্ঠানগুলোর দখল নিন, সাহায্য আসছে’: ইরানের বিক্ষোভকারীদের ট্রাম্প
ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে বিক্ষোভকারীদের রাজপথ না ছাড়ার আহ্বান জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ দেওয়া এক পোস্টে তিনি লিখেছেন, 'ইরানের দেশপ্রেমিকরা, আপনারা বিক্ষোভ চালিয়ে যান। আপনাদের প্রতিষ্ঠানগুলোর দখল নিন। সাহায্য আসছে।'
এদিকে ইরানে কয়েক বছরের মধ্যে হওয়া সবচেয়ে বড় এই বিক্ষোভ দমনে কঠোর অবস্থান নিয়েছে দেশটির প্রশাসন। চলমান এই অস্থিরতায় দেশটিতে এখন পর্যন্ত অন্তত ২ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে সরকারিভাবে জানানো হয়েছে। দুই সপ্তাহ আগে শুরু হওয়া বিক্ষোভ নিয়ে এই প্রথম নিহতের কোনো আনুষ্ঠানিক সংখ্যা জানাল ইরান।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা এইচআরএএনএ অবশ্য নিহতের সংখ্যা আরও বেশি বলে দাবি করেছে। তাদের তথ্যমতে, এখন পর্যন্ত ২ হাজার ৩ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হওয়া গেছে, যাদের মধ্যে ১ হাজার ৮৫০ জনই সাধারণ বিক্ষোভকারী। এ ছাড়া ১৬ হাজার ৭৮৪ জনকে আটক করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
ট্রাম্প তার পোস্টে 'সাহায্য আসছে' বললেও সেটি কী ধরনের সাহায্য, তা পরিষ্কার করেননি। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিষয়টি তাদেরই বুঝে নিতে হবে। তবে ইরানের ওপর কঠোর ব্যবস্থা হিসেবে সামরিক পদক্ষেপের বিষয়টিও তার বিবেচনায় আছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন ট্রাম্প।
তিনি বলেন, ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে নির্ধারিত সব বৈঠক বাতিল করা হয়েছে। বিক্ষোভকারীদের ওপর 'বিবেচনাহীন হত্যাকাণ্ড' বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত এই সিদ্ধান্ত বহাল থাকবে।
ট্রাম্প আরও বলেন, 'বিক্ষোভকারীদের ওপর যারা নির্যাতন চালাচ্ছে, তাদের নাম মনে রাখুন। কারণ এর জন্য তাদের চড়া মূল্য দিতে হবে।'
এদিকে ট্রাম্পের এই মন্তব্যের কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইরান। তেহরানের অভিযোগ, ট্রাম্প ইরানে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে এবং সহিংসতায় উসকানি দিতে এমন মন্তব্য করছেন।
ইরানের পরিস্থিতি ক্রমাগত উত্তপ্ত হতে থাকায় মার্কিন নাগরিকদের জন্য সতর্কতা জারি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর। তুরস্ক বা আর্মেনিয়ার সীমান্ত দিয়ে জরুরি ভিত্তিতে মার্কিন নাগরিকদের ইরান ত্যাগের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ইরানে চলমান অস্থিরতার পেছনে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে দায়ী করেছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। ট্রাম্পের 'সাহায্য আসছে' এমন মন্তব্যের কড়া সমালোচনা করে জাতিসংঘে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত আমির সাইদ ইরাভানি বলেছেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট সহিংসতায় উসকানি দিচ্ছেন। এর মাধ্যমে তিনি ইরানের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা হুমকির মুখে ফেলছেন এবং সরকারকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছেন।
মঙ্গলবার জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে পাঠানো এক চিঠিতে ইরাভানি লেখেন, 'ইরানে নিরপরাধ মানুষের মৃত্যু, বিশেষ করে তরুণদের প্রাণহানির জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সরাসরি দায়ী। এর আইনি দায়ভার তারা এড়াতে পারবে না।'
এদিকে ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বাইরের দেশের হস্তক্ষেপের নিন্দা জানিয়েছে রাশিয়া। মস্কো হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, গত বছরের মতো যুক্তরাষ্ট্র যদি আবারও ইরানে হামলা চালায়, তবে তার ফল মধ্যপ্রাচ্য ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য 'ভয়াবহ' হবে।
অন্যদিকে তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে পর্দার আড়ালে আলোচনার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি জানিয়েছেন, মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ অব্যাহত আছে। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে দেওয়া বিভিন্ন প্রস্তাব খতিয়ে দেখছে তেহরান।
এদিকে, ইরানের বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হলে 'খুবই কঠোর ব্যবস্থা' নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ট্রাম্প। মঙ্গলবার সিবিএস নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, 'যদি তাদের ফাঁসি দেওয়া হয়, তবে আপনারা এমন কিছু (ব্যবস্থা) দেখবেন যা আগে দেখেননি।' তবে এই কঠোর ব্যবস্থা ঠিক কী হতে পারে, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি।
নরওয়েভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা 'ইরান হিউম্যান রাইটস সোসাইটি'র তথ্যমতে, ইরানের কারাগারগুলোতে ফাঁসি কার্যকরের ঘটনা খুবই সাধারণ।
কুর্দি মানবাধিকার সংস্থা 'হেনগাউ' জানিয়েছে, কারাজ শহর থেকে গ্রেপ্তার হওয়া ২৬ বছর বয়সী যুবক এরফান সুলতানির মৃত্যুদণ্ড আজ বুধবার কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। সুলতানির পরিবারকে জানানো হয়েছে যে তার এই দণ্ড চূড়ান্ত। তবে রয়টার্স বা ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম এখন পর্যন্ত এই মৃত্যুদণ্ডের খবরের সত্যতা নিশ্চিত করতে পারেনি।
এরই মধ্যে ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা যেকোনো দেশের পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ২৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক আরোপ করবে। ইরানের তেলের বড় ক্রেতা চীন ইতিমধ্যে এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছে।
