'আমার ৮৭ বই নিষিদ্ধ!' যুক্তরাষ্ট্রের 'সবচেয়ে বেশি' নিষিদ্ধ বইয়ের লেখক হিসেবে যা বলছেন স্টিফেন কিং
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বই নিষিদ্ধের বিতর্ক যেন এক নতুন ঝড়ের মুখে পড়েছে। আর সেই ঝড়ের কেন্দ্রবিন্দুতে আর কেউ নন, স্বয়ং কিংবদন্তী হরর লেখক স্টিফেন কিং। সম্প্রতি তিনি 'মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে নিষিদ্ধ লেখক' হিসেবে নিজের ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।
কেন এই তোলপাড়?
আমেরিকায় বই নিষিদ্ধের ক্রমবর্ধমান প্রবণতা আবারও মুক্তচিন্তা, সেন্সরশিপ এবং শিক্ষাব্যবস্থায় অভিভাবকদের ভূমিকা নিয়ে তুমুল বিতর্ক উস্কে দিয়েছে। আর এই বিতর্কের প্রধান লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছেন স্টিফেন কিং। তার কয়েক ডজন বই বিভিন্ন স্কুল লাইব্রেরি থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে, যা দেশব্যাপী তরুণ পাঠক ও পাঠাগারগুলোর উপর এক গভীর সংকট তৈরি করেছে। মুক্তচিন্তার সমর্থকরা সতর্ক করে বলছেন, এই ধরনের পদক্ষেপ নতুন প্রজন্মের চিন্তার জগৎকে সংকুচিত করে দিচ্ছে। অন্যদিকে, বই নিষিদ্ধের পক্ষের মানুষেরা দাবি করছেন, এর মাধ্যমে তারা শিশুদের 'অনুপযুক্ত' বিষয়বস্তু থেকে রক্ষা করছেন।
কিং কী বলছেন?
গত শুক্রবার, 'এক্স' (সাবেক টুইটার) প্ল্যাটফর্মে স্টিফেন কিং এক পোস্টে নিজেকে 'মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে নিষিদ্ধ লেখক' বলে ঘোষণা করেন। তিনি জানান, দেশজুড়ে তার ৮৭টি বই নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
৭৮ বছর বয়সী এই লেখক তার ৬৮ লক্ষ অনুসারীকে উদ্দেশ্য করে বলেন, 'আমি এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে নিষিদ্ধ লেখক—৮৭টি বই। আমার পরামর্শ, আপনারা এর একটি তুলে নিন এবং দেখুন এত চিৎকার-চেঁচামেচি কিসের জন্য? আত্ম-ধার্মিক বই নিষিদ্ধকারীরা সবসময় তাদের ইচ্ছেমতো চলতে পারে না। এটা এখনও আমেরিকা, ড্যামিট!'
কিং-এর এই পোস্ট মুহূর্তে ভাইরাল হয়ে যায় এবং ৭৫ লক্ষেরও বেশি মানুষ এটি দেখে।
বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই বইগুলো পাবলিক স্কুল লাইব্রেরি থেকে সরানো হয়েছে, দেশব্যাপী সাধারণ বিতরণের জন্য নয়। এর প্রধান কারণ হিসেবে প্রাপ্তবয়স্কদের বিষয়বস্তুর কথা বলা হলেও, সমালোচকদের মতে, এর আড়ালে রয়েছে বিশেষ কোনো আদর্শ চাপিয়ে দেওয়ার রাজনীতি।
বিশেষ করে ফ্লোরিডা রাজ্যে, স্কুলের বইয়ের তাকে যৌন উত্তেজক বিষয়বস্তু সংক্রান্ত আইন পাসের পর কিং-এর বইগুলো গণহারে নিষিদ্ধ করা হয়। গত বছর সেখান থেকে তার ২৩টি বই সরানোর পর কিং সামাজিক মাধ্যমে লিখেছিলেন: 'ফ্লোরিডা আমার ২৩টা বই নিষিদ্ধ করেছে। হোয়াট দ্য ফা*?'**
সেই সময় নিউজউইককে দেওয়া এক বিবৃতিতে কিং যোগ করেন: 'আমি এটা আগেও বলেছি, এবং আবারও বলব: যখন স্কুল লাইব্রেরি থেকে বই নিষিদ্ধ করা হয়, তখন পাবলিক লাইব্রেরিতে, বা নিকটস্থ বইয়ের দোকানে ছুটে যাও এবং পড়ো যা গুরুজনেরা তোমাকে জানতে দিতে চান না।'
কিং-এর নিষিদ্ধ কিছু বইয়ের মধ্যে রয়েছে দ্য গানস্লিঙ্গার, দ্য রানিং ম্যান, ক্যারি, ফোর পাস্ট মিডনাইন, ব্যাগ অফ বোনস এবং ইট।
স্টিফেন কিং দীর্ঘদিন ধরেই বই নিষিদ্ধকরণ সংস্কৃতির বিরুদ্ধে সোচ্চার। ১৯৯২ সালে তিনি দ্য ব্যাংগর ডেইলি নিউজ-এর জন্য লেখা একটি কলামে লিখেছিলেন:
'প্রথমত, ছোটদের উদ্দেশ্যে: তোমাদের শহরে এমন কিছু লোক আছে যারা তোমাদের স্কুল লাইব্রেরির তাক থেকে কিছু বই সরিয়ে দিয়েছে। তাদের সাথে তর্ক কোরো না; প্রতিবাদ কোরো না; বইগুলো তাক-এ ফিরিয়ে আনার জন্য সমাবেশ সংগঠিত বা তাতে যোগ দিও না। তোমাদের সময় বা শক্তি নষ্ট কোরো না। পরিবর্তে, দ্রুত তোমাদের পাবলিক লাইব্রেরিতে চলে যাও, যেখানে গণতন্ত্রে এই ভীতু মানুষদের নাগাল পৌঁছাতে পারে না, অথবা তোমাদের স্থানীয় বইয়ের দোকানে যাও এবং নিষিদ্ধ হওয়া বইটির একটি কপি সংগ্রহ করো। এটি মনোযোগ সহকারে পড়ো এবং আবিষ্কার করো যে তোমাদের গুরুজনেরা তোমাদের কী জানতে দিতে চায় না।'
তিনি আরও যোগ করেন: 'দ্বিতীয়ত, এই শহরের অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে: এমন কিছু লোক আছে যারা সিদ্ধান্ত নিচ্ছে আপনার সন্তানরা কী পড়তে পারবে, এবং আপনি কী ভাবছেন তা নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই, কারণ তারা নিশ্চিত যে কোনটি সঠিক এবং কোনটি নয় সে সম্পর্কে তাদের ধারণা আপনার চেয়ে ভালো, আপনার চেয়ে স্পষ্ট। আপনি কি তা বিশ্বাস করেন? বই নিষিদ্ধকারীদের এই বাতিলের অধিকার দেওয়ার আগে সাবধানে চিন্তা করুন, এবং মনে রাখবেন যে তারা গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে না, বরং এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক স্বৈরতন্ত্রে বিশ্বাস করে। যদি তাদের নিজেদের মতো চলতে দেওয়া হয়, তবে অনেক ভালো সাহিত্য শীঘ্রই স্কুল লাইব্রেরি থেকে অদৃশ্য হয়ে যাবে, কারণ ভালো বই—যে বইগুলো আমাদের ভাবতে এবং অনুভব করতে শেখায়—সবসময়ই বিতর্কের জন্ম দেয়।'
এই বিতর্কের মাঝেই কিং তার ভক্তদের জন্য সুখবর দিয়েছেন। তিনি থ্রেডস-এর মাধ্যমে নিশ্চিত করেছেন যে তার নতুন বই, ট্যালিসম্যান ৩, 'প্রায় শেষ।'
অনুবাদ : নাফিসা ইসলাম মেঘা
