‘তিন দিন ধরে একমুঠো ভাতও খাইনি’: বিজয় দিবসেও এক বৃদ্ধের ক্ষুধার সঙ্গে লড়াই
'ভাই, তিন দিন ভাত খাই নাই। স্মৃতিসৌধ বন্ধ থাকলে রুজিও হয় না। কিনে খাওয়ার সামর্থ্যও নেই। কোনোদিন একটা বড়া, কোনোদিন একটা সিগারেট—এইভাবেই দিন কাটে।'
কথাগুলো বলছিলেন ষাটোর্ধ্ব মোহাম্মদ ইউনুস আলী। ওজন মাপার যন্ত্র নিয়ে তিনি বসেন জাতীয় স্মৃতিসৌধ চত্বরে। বিজয় দিবসে যখন চারদিকে উৎসবের আমেজ, বাতাসে পতাকার পতপত শব্দ আর মানুষের আনন্দ, তখন ইউনুস আলীর জীবনে চলছে অনাহারের এক নীরব লড়াই।
বিজয় দিবস তার কাছে কী—জানতে চাইলে একটু থেমে দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি বলেন, 'বিজয় দিবস ভালো। সবাই আনন্দ করুক। কিন্তু আমার জন্য দিনটা ভালো না। তিন দিন ধরে পেটে একমুঠো ভাতও পড়ে নাই।'
জাতীয় স্মৃতিসৌধে আসা দর্শনার্থীদের ভিড়ই তার আয়ের একমাত্র উৎস। কেউ ওজন মাপলে সামান্য কিছু টাকা মেলে। কিন্তু নিরাপত্তাজনিত কারণে স্মৃতিসৌধ বন্ধ থাকলেই তার আয়-রোজগার একেবারে বন্ধ হয়ে যায়।
আবেগজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, 'কাকা, আমার কথা আর জিগাইস না। মাপার দরকার থাকলে মাইপা, যা ইচ্ছা দিয়া থুইয়া যা। আমার বুকটা ফাইটা যাইতাছে।'
ইউনুস আলীর গ্রামের বাড়ি পাবনার বেড়া উপজেলায়। বর্তমানে তিনি সাভারের নবীনগর এলাকায় থাকেন। সংসারে তিনি ও তার স্ত্রী; কেবল এই দুজনই। সন্তান থাকলেও তারা বাবা-মায়ের কোনো খোঁজখবর নেয় না।
নিজের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, 'বয়স হইছে, এখন আর তেমন কাজ জোটে না। তাই যা পাই তাই খাই, না পাইলে না খাইয়া থাকি।'
বিজয় দিবসে রাষ্ট্রের কাছে তার প্রত্যাশা কী—এমন প্রশ্নে বড় কোনো দাবি না করলেও তিনি বলেন, 'দেশে শান্তি থাকুক। আমি রুজি না করলেও দুঃখ নাই। কিন্তু একটা ভালো সরকার দরকার।'
নিজের ভোটাধিকার হরণের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথাও শোনান ইউনুস আলী। বলেন, 'গত উপজেলা নির্বাচনে ভোট দিতে গেছিলাম। কেন্দ্রে যাওয়ার পর কইল, কাকা, আপনার ভোট হইয়া গেছে।'
ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, 'আমিই আমার ভোটের মালিক। পরিবেশ সুষ্ঠু হলে ভোট দিমু, না হইলে দিমু না।'
সমসাময়িক অনেক রাজনীতিবিদের সমালোচনা করলেও তিনি শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নাম। ইউনুস আলীর ভাষায়, 'শেখ মুজিব, জিয়া, এরশাদ, সবারই সমালোচনা আছে। কিন্তু ভাসানীর কোনো সমালোচনা নাই।'
কুষ্টিয়ায় মওলানা ভাসানীকে সামনাসামনি দেখার স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, 'ভাসানী বলতেন, ভোটের বাক্সে লাথি মারো; আগে খাওয়ার আর থাকার ব্যবস্থা করো।'
চরম অভাব তাকে এমন এক সিদ্ধান্তের দোরগোড়ায় নিয়ে গেছে, যেখানে নিজের শরীরই হয়ে উঠেছে শেষ সম্বল। পেটের দায় মেটাতে দিনের পর দিন তিনি কিডনি বিক্রির চেষ্টা করছেন। ইউনুস আলী বলেন, 'না খাইয়া মরার চাইতে কিডনি বেচা ভালো।' এক লাখ টাকার বিনিময়ে কিডনি দিতে রাজি হলেও এখন পর্যন্ত কোনো উপায় খুঁজে পাননি তিনি।
মহান বিজয় দিবস প্রতিটি বাংলাদেশির জন্য এক গৌরবময় ইতিহাসের অংশ। কিন্তু স্মৃতিসৌধের পাদদেশে দাঁড়িয়ে থাকা মোহাম্মদ ইউনুসের এই জীবনগল্প যেন আমাদের নতুন করে মনে করিয়ে দেয় স্বাধীনতার প্রকৃত প্রতিশ্রুতি এবং মানুষের মৌলিক অধিকারের কথা।
