রিসোর্টের আগুনে একই পরিবারের ছয়জন নিহত, দোতলা থেকে লাফ দিয়ে বাঁচেন আশিকুল
কক্সবাজারের ইনানীর পাটুয়ারটেক সমুদ্র সৈকত এলাকার 'টুপটুপ রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড রিসোর্ট'-এ ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। দুর্ঘটনায় রিসোর্ট ভবনের দ্বিতীয় তলা থেকে লাফ দিয়ে নিজের জীবন বাঁচিয়েছেন মো. আশিকুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি, তবে প্রাণ হারিয়েছেন তার স্ত্রী-শ্যালিকাসহ পরিবারের ছয় সদস্য।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকাল ৭টার দিকে মেরিন ড্রাইভের পাটুয়ারটেক সমুদ্র সৈকত সংলগ্ন ওই রিসোর্টে এই অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন আরও অন্তত ছয়জন।
খবর পেয়ে সকাল ৮টা থেকে ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট একযোগে কাজ শুরু করে এবং সকাল ১০টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
নিহতদের মধ্যে সাতজনের পরিচয় নিশ্চিত করা গেছে। এর মধ্যে ঢাকার বনশ্রী এলাকা থেকে পরিবার ও স্বজনদের নিয়ে গত বৃহস্পতিবার রিসোর্টটিতে বেড়াতে এসেছিলেন মো. আশিকুল ইসলাম। তার সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী ইসরাত জাহান মালিহা, শ্যালিকা লায়লা জাহান নাবিলা এবং অপর নিকটাত্মীয়রা।
আশিকুল ইসলাম জানান, শনিবার সকালে আগুন লাগার আগে পরিবারের দুজন রিসোর্ট থেকে বের হয়ে সৈকতে ঘুরতে গিয়েছিলেন। আগুন লাগার পর তিনি দোতলা থেকে লাফিয়ে নিরাপদে বের হতে সক্ষম হলেও নিখোঁজ ছিলেন অন্য স্বজনরা। পরবর্তীতে উদ্ধার করা ১০ জনের মরদেহের মধ্যে তার স্ত্রী ও শ্যালিকাসহ একই পরিবারের ছয়জন সদস্য রয়েছেন।
একই পরিবারের নিহত ওই ছয়জন হলেন—মিলিতা মেহজাবিন আলভি, ফারিহা কবির, নাফিস তেহামি জেরিফ এবং ফায়িজান আহমদ। এদের মধ্যে আলভি ও জেরিফ সম্পর্কে মালিহা ও নাবিলার কাজিন, ফারিহা কবির জেরিফের বড় বোন এবং ফায়িজান ভাগ্নে।
নিহতদের তালিকায় অপর একজন হলেন ঢাকার আশুলিয়ার নাসরিন আকতার মুক্তা (২৮)। তবে বাকি তিনজনের পরিচয় এখনও শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
আহতদের চিকিৎসাধীন অবস্থা
অগ্নিকাণ্ডের এই ঘটনায় আহত ছয়জনকে দ্রুত উদ্ধার করে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। তারা হলেন—মুগধা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. শিহাব উদ্দীন (৩১), তার স্ত্রী নাফিজা নেওয়াজ খান (২৯), মান্নান (৩৪), মেহেরুন্নেসা (৩০), মাসুদ (৩০) এবং সামিদা (৩২)। কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানিয়েছেন, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ৪ জনকে ভর্তি রাখা হলেও প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে ২ জনকে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে।
দুপুর ২টা পর্যন্ত ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার এবং ৬ জন আহত হওয়ার তথ্য নিশ্চিত করেছেন কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের উপ-সহকারী পরিচালক সৈয়দ মোরশেদ হোসেন। তিনি জানান, এখনও উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং রিসোর্টটির প্রতিটি কক্ষ পুরোপুরি তল্লাশী করতে না পারায় নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।
এদিকে, আগুন লাগার কারণ তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। তবে ঘটনা তদন্তে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে (এডিএম) প্রধান করে পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন।
ছিল না ফায়ার সার্ভিস ও কউক-এর লাইসেন্স
এদিকে, ঢাকায় এক প্রেস ব্রিফিংয়ে ফায়ার সার্ভিসের নবনিযুক্ত মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জানিয়েছেন, পাটুয়ারটেক এলাকার টুপটুপ রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড রিসোর্টটির ফায়ার সার্ভিসের কোনো লাইসেন্স ছিল না। এমনকি এ বিষয়ে রিসোর্ট কর্তৃপক্ষকে আগে সতর্ক করা হলেও তারা কোনো লাইসেন্স নেয়নি।
একই তথ্য নিশ্চিত করে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কউক) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন জানান, রিসোর্টটি নির্মাণের জন্য কউক-এর কোনো ধরনের অনুমতিও নেওয়া হয়নি।
রিসোর্ট ম্যানেজার আটক
এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর টুপটুপ রিসোর্টের ম্যানেজার মোহাম্মদ সুমনকে আটক করেছে পুলিশ। শনিবার বিকেল সাড়ে চারটার দিকে উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান মজুমদার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে ও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সুমনকে থানায় আটক রাখা হয়েছে। এ বিষয়ে পরবর্তীতে বিস্তারিত জানানো হবে।
