মোহাম্মদপুর: মোগল আমলের জনপদ থেকে ঢাকার অপরাধের হটস্পট
মোহাম্মদপুর ঢাকার পশ্চিম প্রান্তের একটি সুপরিচিত আবাসিক এলাকা। একসময় ইতিহাস, স্থাপত্য ও মধ্যবিত্ত আবাসিক এলাকার জন্য পরিচিত এই এলাকা—গত কয়েক দশকে আরেকটি পরিচয় তৈরি করেছে, অপরাধের হটস্পট হিসেবে।
তবে মোহাম্মদপুরে এই অপরাধের সংস্কৃতি নতুন নয়। অন্তত চার দশক ধরে অপরাধী, তাদের অপরাধের ধরন এবং নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার পদ্ধতি সময়ের সঙ্গে বদলেছে।
৫ আগস্ট ২০২৪-এর পর রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়া, দুর্বল পুলিশিং এবং আধিপত্য বিস্তারের নতুন লড়াই মোহাম্মদপুরে গুলি, সংঘর্ষ, ছিনতাই, কিশোর গ্যাং, চাঁদাবাজি ও মাদক ব্যবসায় নতুন মাত্রা দিয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর দাবি, গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মোহাম্মদপুরের অপরাধ পরিস্থিতির একটি অতিরঞ্জিত চিত্র তৈরি করেছে।
র্যাব-২-এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি নাইমুল হাসান মনে করেন, মোহাম্মদপুর শুধু অপরাধীদের আবাসস্থল, এমন একটি 'মিথ' তৈরি করা হয়েছে। মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মেজবাহ উদ্দিনও একই ধরনের দাবি করে বলেছেন, এলাকাটি নিয়ে 'ভুল তথ্য' ছড়ানো হচ্ছে।
কিন্তু মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি তাদের এই খাটো করে দেখার বক্তব্যের সঙ্গে মেলে না।
কাহিনির শুরু মোগল আমলে
মোহাম্মদপুরের গল্প অপরাধ দিয়ে শুরু হয়নি। এর ইতিহাস ৪০০ বছরেরও বেশি পুরোনো। ১৬০৮ সালে ইসলাম খান ঢাকাকে বাংলার রাজধানী করার পর, বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ নদীর তীর ধরে শহরটি সম্প্রসারিত হতে থাকে। এই সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে এই এলাকাতেও জনবসতি গড়ে উঠতে শুরু করে।
১৬৮০ সালে নির্মিত সাত গম্বুজ মসজিদ এখনো সেই সময়ের স্মারক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। পরে পাকিস্তান আমলে পশ্চিম ঢাকার পরিকল্পিত নগরায়ণের অংশ হিসেবে মোহাম্মদপুর মডেল টাউন গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়।
তখন এলাকাটি মোহাম্মদপুরের চেয়ে 'রায়েরবাজার' নামেই বেশি পরিচিত ছিল। ইতিহাসবিদ আবু মো. দেলওয়ার হোসেন বলেন, ১৯৬০-এর দশকে মোহাম্মদপুরের বর্তমান পরিচয় গড়ে উঠতে শুরু করে, আর রায়েরবাজার পরিচয় ধীরে ধীরে পেছনে চলে যায়।
মোগল সম্রাট বাবর, হুমায়ূন, শাহজাহান, আওরঙ্গজেব ও নূরজাহানের মতো মুসলিম শাসনের বিভিন্ন ব্যক্তিত্বের নামে এখানকার সড়কগুলোর নামকরণ করা হয়।মডেল টাউনকে রক্ষার জন্য নির্মিত বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধটি পরে রিং রোড নামে পরিচিতি পায়।
স্বাধীনতার পর মোহাম্মদপুরের ইতিহাসে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় যুক্ত হয়, জেনেভা ক্যাম্প। আটকে পড়া উর্দুভাষী জনগোষ্ঠীর জন্য একটি বসতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত এই ক্যাম্প ধীরে ধীরে ঘনবসতিপূর্ণ একটি এলাকায় পরিণত হয়।
১৯৮০-এর দশকে মোহাম্মদপুর মধ্যবিত্ত সরকারি কর্মকর্তা, শিক্ষক ও অন্যান্য পেশাজীবীদের আবাসিক এলাকা হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে। একই সময়ে এর বিভিন্ন মহল্লায় ছোট ছোট অপরাধী চক্রও গড়ে উঠতে শুরু করে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ ও সমাজ বিশ্লেষক মো. তৌহিদুল হক বলেন, কোনো এলাকায় অপরাধভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হলে এবং অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলো যথাযথ ব্যবস্থা নিতে ধীরগতি দেখালে, এলাকাটি ধীরে ধীরে অপরাধপ্রবণ হয়ে ওঠে। বছরের পর বছর ধরে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো বলছে, মোহাম্মদপুরে ঠিক এটাই ঘটেছে।
'গডফাদার' সংস্কৃতির উত্থান
১৯৮০ ও ১৯৯০-এর দশকে ছোট ছোট অপরাধী চক্র বড় হতে শুরু করে। ১৯৯১ সালে একটি নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার পর চাঁদাবাজি, সরকারি ঠিকাদারির কাজ নিয়ন্ত্রণ ও এলাকাভিত্তিক আধিপত্য নিয়ে সংঘাত তীব্র হয়।
১৯৯০-এর দশকে সানজিদুল ইসলাম ইমন, নাইম আহমেদ টিটন, ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলাল এবং তোফায়েল আহমেদ ওরফে জোসেফসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসীর উত্থান ঘটে।
১৯৯৯ সালে জোসেফের ভাই সাঈদ আহমেদ টিপু খুন হন। নথিপত্রে আরও দেখা যায়, এর আগের সাত বছরে এলাকাভিত্তিক আধিপত্য নিয়ন্ত্রণের সংঘাতে অন্তত সাতজন নিহত হন।
২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় থাকার সময় পুলিশ দেশের শীর্ষ সন্ত্রাসীদের একটি তালিকা প্রকাশ করে। তাদের মধ্যে চারজনই ছিলেন মোহাম্মদপুরের: সানজিদুল ইসলাম ইমন, নাইম আহমেদ টিটন, পিচ্চি হেলাল এবং তোফায়েল আহমেদ ওরফে জোসেফের ভাই হারিস আহমেদ। হারিস ছাড়া বাকিদের সবাইকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে।
১৯৯৬ সালের একটি হত্যা মামলায় দণ্ডিত হারিস পলাতক ছিলেন। পরে ২০১৯ সালের মার্চে তিনি ক্ষমা পান। এর এক বছর আগে, ২০১৮ সালে তার ভাই জোসেফও রাষ্ট্রপতির ক্ষমায় কারাগার থেকে মুক্তি পান এবং নীরবে দেশ ছাড়েন। সে সময় তাদের ভাই জেনারেল আজিজ আহমেদ বাংলাদেশের সেনাপ্রধান ছিলেন। ওই সময় এসব ঘটনা গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দেয়।
আহমেদ পরিবারকে 'দ্য গডফাদার' চলচ্চিত্রে দেখানো কর্লিওনি পরিবারের মতো মনে হচ্ছিল; এমন একটি পরিবার, যারা একসময় পুরো এলাকাটি নিয়ন্ত্রণ করত। পাঁচ ভাইয়ের একজন ১৯৯০-এর দশকে মারা গেলেও—বাকি চারজন অপরাধজগতের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন।
এই অপরাধী নেটওয়ার্কের কাঠামো 'দ্য গডফাদার'-এ দেখানো জগতের সঙ্গে অনেকটা একই রকম মনে হতে পারে; যেখানে পরিবার, অর্থ, আনুগত্য ও রাজনৈতিক যোগাসাজশ অস্ত্রের সঙ্গে মিলে একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক তৈরি করে। বাস্তবতা অবশ্য সিনেমা নয় অবশ্যই। তবে মোহাম্মদপুরের অপরাধজগতে একই পরিবারের একাধিক সদস্যের সম্পৃক্ততা এমন তুলনা এড়িয়ে যাওয়া কঠিন করে তোলে।
প্রতিবেদনগুলো বলছে, ২০০১ সাল থেকে পরবর্তী কয়েক বছরে মোহাম্মদপুরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘাতে বিএনপির নেতা-কর্মীসহ অন্তত ৪০ জন নিহত হন। ২০০৪ সালে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) গঠনের পর কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসী কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন। এতে পুরোনো অপরাধী নেতৃত্বের অনেক সদস্যকে এলাকা ছাড়তে হয়।
কিন্তু অপরাধের কাঠামো বিলীন হয়নি।
পুরোনো অপরাধ, নতুন প্রজন্ম
২০০৯ সালের পর মোহাম্মদপুরে কিশোর গ্যাংয়ের উত্থানের মধ্য দিয়ে অপরাধের নতুন অধ্যায় শুরু হয়। এসময়েই বসিলা, আদাবর, চাঁদ উদ্যান, ঢাকা উদ্যান, বাঁশবাড়ী, খালপাড় ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের বস্তিসহ বিভিন্ন এলাকায় নিম্নআয়ের বসতি দ্রুত সম্প্রসারিত হয়।
নতুন আবাসন প্রকল্প, জমি দখল ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে অনেক তরুণ অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক নেতারা নিজেদের স্বার্থে কিশোর গ্যাং ব্যবহার করেছেন।
মোহাম্মদপুর কমিউনিটি অ্যালায়েন্সের সংগঠক পারভেজ হাসান সুমন অভিযোগ করেন, রাজনৈতিক নেতারা বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন এনে বসতি স্থাপনে সহায়তা করেছেন, যাতে জমি দখল ও মাদক সিন্ডিকেট পরিচালনায় তাদের সহায়তা পাওয়া যায়।
বিএনপির ৩৩ নম্বর ওয়ার্ড ইউনিটের সাধারণ সম্পাদক শেখ মো. জহিরুল ইসলাম অপু বলেন, বেকার তরুণেরা ১০ থেকে ১২ জনের ছোট ছোট দল গঠন করে এবং ধীরে ধীরে অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। এসব দল পরে কিশোর গ্যাং হিসেবে পরিচিত হয়।
৫ আগস্টের পর সেই কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা হারানোর পর অনেক কিশোর গ্যাং নিজেদের আয়ের উৎস খুঁজতে শুরু করে। স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, তারা এখন সরকারি জমিতে রিকশার গ্যারেজ, গাছের নার্সারি ও মাদক বিক্রির স্পট তৈরি করে অর্থ আয় করছে।
৫ আগস্টের পর অপরাধী চক্রগুলোর পুনরুত্থান
ক্ষমতার পরিবর্তনের পর বেশ কয়েকজন পুরোনো অপরাধী আবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসেন। সানজিদুল ইসলাম ইমন এবং ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলাল ২০২৪ সালের আগস্টে জামিনে মুক্তি পান। পরে পুলিশ মোহাম্মদপুরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তাদের মধ্যে গোপন দ্বন্দ্বের কথা জানায়। আরও বেশ কয়েকটি কিশোর গ্যাং আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী বাদল ওরফে কিলার বাদলের নির্দেশনায় পরিচালিত হচ্ছে বলেও জানা যায়, যদিও তাকে কখনো প্রকাশ্যে দেখা যায়নি।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে রায়েরবাজারে নাসির ও মুন্না হত্যার ঘটনায় পিচ্চি হেলালসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়। পরে চলতি বছরের এপ্রিলে ১৮টি মামলার আসামি অ্যালেক্স ইমনকে প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।
এদিকে জুলাই ও আগস্টে পাটালি, সাব্বির ও কবজি কাটা আনোয়ারের নেতৃত্বাধীন গ্রুপগুলোর সংঘর্ষ আবারও কিশোর গ্যাং ও অন্যান্য অপরাধী চক্রের উপস্থিতি প্রকাশ্যে নিয়ে আসে।
১৪ আগস্ট একটি হত্যা মামলায় চারজনকে গ্রেপ্তারের পর র্যাব-২ দাবি করে, মোহাম্মদপুরে আর কোনো সক্রিয় কিশোর গ্যাং নেই। কিন্তু কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রায়েরবাজারের পাবনা গলি ও ক্যানসার গলিতে পাটালি ও সাব্বির গ্রুপের মধ্যে রাতভর সংঘর্ষ ওই দাবিকে প্রশ্নের মুখে ফেলে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে বর্তমানে ২০টিরও বেশি গ্যাংয়ের নাম পরিচিত। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো পাটালি, লেভেল হাই, কবজি কাটা আনোয়ার, সাব্বির, ডাইল্লা, অ্যালেক্স, গাঙচিল, লে ঠেলা, ভাইবা ল' কিং এবং ঘুটা দে।
র্যাব-২-এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি নাইমুল হাসান দাবি করেন, "আপনারা যে প্রচলিত সন্ত্রাসী ও স্থানীয় মাস্তানদের কথা বলছেন, তারা এখন আর নেই। দীর্ঘ সময় পর একটি নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এসেছে এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সম্ভাব্য সব পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে আমি বিশ্বাস করি।"
গলি, বসতি ও পালানোর পথের গোলকধাঁধা
মোহাম্মদপুরের অপরাধ পরিস্থিতি বুঝতে এর ভৌগোলিক অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকার অনেক এলাকায় প্রতি বর্গকিলোমিটারে ২৫ হাজার থেকে ৪৫ হাজার মানুষ বসবাস করলেও বিভিন্ন জরিপ বলছে, মোহাম্মদপুরে এই সংখ্যা ৭০ হাজারের বেশি।
বসিলা ব্রিজ ও আশপাশের এলাকায় বিভিন্ন আকারের অন্তত ৩৫টি আবাসন প্রকল্প রয়েছে। প্রধান সড়কের বাইরে রয়েছে অসংখ্য সরু গলি, নিম্নআয়ের মানুষের ঘনবসতি এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের পাশের জনপদ। এসব এলাকায় অপরাধীদের শনাক্ত করা এবং অভিযান পরিচালনা করা কঠিন।
তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার ইবনে মিজান বলেন, নদীর ওপারের কেরানীগঞ্জের সঙ্গে মোহাম্মদপুরের যোগাযোগ অপরাধীদের সহজে পালানোর সুযোগ দেয়। তারা নদী পার হয়ে অপরাধ করে, আবার অন্য পাড়ে ফিরে যেতে পারে। আবাসন প্রকল্পগুলোর মধ্যে নির্মাণশ্রমিক বা অন্য কোনো পেশার মানুষ পরিচয়ে তারা লুকিয়েও থাকতে পারে।
পুলিশের নথি বলছে, ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত এলাকায় ১০টি হত্যাকাণ্ড, দুটি ডাকাতি, আটটি ছিনতাই এবং চারটি অপহরণের ঘটনা ঘটে। ২০২২ ও ২০২৩ সালেও অপরাধের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছিল, তবে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম ছিল।
২০২৬ সালের জুনে পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট হয়, যখন ছিনতাইকারীরা আদাবর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাসহ দুই পুলিশ সদস্যের ওপর হামলা চালিয়ে তাদের আহত করে।
পুরোনো চাঁদাবাজির ব্যবস্থা নতুন হাতে
৫ আগস্টের আগে মোহাম্মদপুরজুড়ে নার্সারি, গ্যারেজ ও ফুটপাতের দোকান থেকে স্থানীয় রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে টাকা আদায়ের অভিযোগ ছিল। এখন তাদের জায়গা নিয়েছে কিশোর গ্যাং।
বসিলা-রিং রোড এলাকায় অটোরিকশা ও সিএনজিচালিত যানবাহনের অন্তত ৪০টি নার্সারি ও গ্যারেজ রয়েছে। স্থানীয় এক নার্সারি মালিক বলেন, কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা বর্তমানে তার কাছ থেকে মাসে ৮ হাজার টাকা আদায় করছে। এক গ্যারেজ মালিকও জানান, তিনি প্রতি মাসে ৮ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা চাঁদা দেন।
বসিলা থেকে মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত ফুটপাতে প্রতিদিন প্রায় ২০০টি দোকান বসে। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিটি দোকান থেকে মাসে ৩ হাজার টাকা করে আদায় করা হয়।
তবে পুলিশ এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মেজবাহ উদ্দিন বলেন, পুলিশ ও অপরাধীদের মধ্যে যোগসাজশের অভিযোগ পুলিশ কর্মকর্তাদের নিরুৎসাহিত করে। তিনি আরও বলেন, কোনো পুলিশ কর্মকর্তার এমন সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
র্যাবের অতিরিক্ত ডিআইজি নাইমুল হাসান বলেন, চাঁদাবাজির অনেক ভুক্তভোগী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার কাছে অভিযোগ করেন না। ফলে অপরাধীদের শনাক্ত করা এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
জেনেভা ক্যাম্প: মোহাম্মদপুরের ভেতরে একটি শহর
মোহাম্মদপুরের অপরাধ নিয়ে কোনো আলোচনাতেই জেনেভা ক্যাম্পকে বাদ দেওয়া যায় না। ক্যাম্পের প্রায় ১৭ একর এলাকায় অন্তত ৭০ হাজার মানুষ বসবাস করেন। সীমিত সরকারি সেবা, শিক্ষায় দুর্বল প্রবেশাধিকার এবং বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশনের ঘাটতি এই জনগোষ্ঠীকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। দীর্ঘদিনের মাদক ব্যবসার অভিযোগ সমস্যাটিকে আরও জটিল করেছে।
ক্যাম্পের সরু গলিগুলোতে প্রকাশ্যে ইয়াবা ও গাঁজা বিক্রি হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। পুলিশের ভাষ্য, অভিযানের সময় মূল সড়কে পুলিশ সদস্যদের দেখতে পেলে বিক্রেতারা দ্রুত ভেতরের গলিতে চলে যায়। গলির গোলকধাঁধার মতো কাঠামোর কারণে পুলিশ তাদের ধাওয়া করে গ্রেপ্তার করতে সমস্যায় পড়ে।
৫ আগস্টের পর ক্যাম্পের মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কয়েকটি গ্রুপের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলো অভিযান চালিয়ে বুনিয়া সোহেল, গালকাটা মনু ও পিচ্চি রাজাসহ বেশ কয়েকজন সন্দেহভাজন অপরাধীকে মাদক-সম্পর্কিত অভিযোগে গ্রেপ্তার করেছে। তবে তাদের কেউ কেউ জামিনে বেরিয়ে আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে এমন অভিযোগও রয়েছে।
র্যাব ও পুলিশের অভিযান সত্ত্বেও মাদক ব্যবসা পুরোপুরি বন্ধ করতে না পারায়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
তৌহিদুল হক মনে করেন, কিছু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্মকর্তা অপরাধীদের আইনি প্রক্রিয়ার সুযোগ নিতে সহায়তা করেন। তবে তিনি স্পষ্ট করেছেন, এই অভিযোগ সব কর্মকর্তার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।
তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার ইবনে মিজান বলেন, তদন্তে দায়ী হিসেবে শনাক্ত হওয়া পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
শুধু অভিযান চালানোই কেন যথেষ্ট নয়
মোহাম্মদপুরের অপরাধের কাহিনি শুধু কিশোর গ্যাং, মাদক ব্যবসায়ী বা কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসীকে ঘিরে নয়। চার দশকের বেশি সময় ধরে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, জমি দখল, অপরাধভিত্তিক অর্থনীতি, অতিরিক্ত জনঘনত্ব, বেকারত্ব, মাদক ব্যবসা এবং দুর্বল আইনশৃঙ্খলা মিলে একটি জটিল কাঠামো তৈরি করেছে।
৫ আগস্টের পর পুরোনো কাঠামোর নিয়ন্ত্রণ বদলেছে, কিন্তু অপরাধভিত্তিক অর্থনীতি টিকে গেছে। ফলে এক গ্রুপের জায়গায় আরেক গ্রুপ এসেছে, একই সঙ্গে অভিযোগ উঠেছে যে পুরোনো পৃষ্ঠপোষকদের জায়গায় নতুন পৃষ্ঠপোষকেরা এসেছে।
তৌহিদুল হকের মতে, মোহাম্মদপুরের মানুষ বোঝেন কেন তাদের এলাকা অপরাধপ্রবণ হয়ে উঠেছে। এখন তারা দেখতে চান, রাষ্ট্র ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলো কীভাবে তাদের এই পরিস্থিতি থেকে মুক্ত করবে।
তাই ৪০০ বছরের ইতিহাসের মোহাম্মদপুরের ভবিষ্যৎ শুধু আরও অভিযান পরিচালনার ওপর নির্ভর করে না। অপরাধভিত্তিক অর্থনীতি, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, মাদক ব্যবসা ও চাঁদাবাজির পেছনের নেটওয়ার্কগুলো ভেঙে না দেওয়া হলে— গ্রেপ্তার ও অভিযান সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু নতুন অপরাধী তৈরি হতেই থাকবে।
মোহাম্মদপুরের বাসিন্দারা চান, তাদের এলাকাকে যেন আর অপরাধের সমার্থক হিসেবে দেখা না হয়। আর এই পরিবর্তনের জন্য দরকার আইন প্রয়োগের ধারাবাহিকতা, উন্নত জনসেবা, কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক উদ্যোগ।