সাপ্লাই চেইন ট্রেসেবিলিটি নিয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা চান রপ্তানিকারকেরা
আগামী বছর থেকে আমদানি করা পণ্যের জন্য বাধ্যতামূলক ট্রেসেবিলিটি ব্যবস্থা চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। এর মাধ্যমে পণ্যের কার্বন ফুটপ্রিন্ট বা কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ শনাক্ত করার পাশাপাশি পুরো সাপ্লাই চেইনে কার্বন নিঃসরণ কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। তবে এই ব্যবস্থা কীভাবে কার্যকর হবে এবং তা বাস্তবায়নে বাংলাদেশি রপ্তানিকারক বা সরবরাহকারীরা কী ধরনের প্রস্তুতি নেবেন, সে বিষয়ে এখনও স্পষ্ট কোনো নির্দেশনা তারা পাননি।
এদিকে, বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের পোশাক কারখানাগুলোর জন্য একাধিক কাঁচামাল সরবরাহকারীর কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ, একটি সমন্বিত ডেটা প্ল্যাটফর্ম তৈরি এবং ব্যবস্থা বাস্তবায়নের অতিরিক্ত ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
টেকসই রূপান্তর নিশ্চিত করতে সাপ্লাই চেইনের সব অংশীজনকে যৌথভাবে দায়িত্ব নেওয়ার আহ্বানও জানিয়েছেন তারা।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) পরিচালক মিনহাজুল হক বলেন, "২০২৭ সাল থেকে সাপ্লাই চেইনের ট্রেসেবিলিটির পদ্ধতি ডিজিটাল প্রোডাক্ট পাসপোর্ট (ডিপিপি) চালু হতে যাচ্ছে। তবে এ বিষয়ে আমরা এখনও কোনো নির্দেশনা পাইনি।"
আজ সোমবার (৪ অক্টোবর) ঢাকার একটি হোটেলে 'সার্কুলার টেক্সটাইলস বাংলাদেশ: অ্যাডভান্সিং ট্রেসেবিলিটি অ্যান্ড ডিকার্বনাইজেশন' শীর্ষক অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।
আন্তর্জাতিক সংগঠন সলিডারিডাড নেদারল্যান্ডসের দূতাবাস, নেদারল্যান্ডস এন্টারপ্রাইজ এজেন্সি (আরভিও), কয়েকটি ডাচ রিটেইল ব্র্যান্ড, প্রযুক্তি উদ্ভাবক এবং বাংলাদেশের বিভিন্ন বাণিজ্যিক সংগঠন যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
মিনহাজুল হক বলেন, স্থানীয় মূল্য সংযোজনে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ অবদান রাখা প্রতিষ্ঠানগুলোকে তথ্য ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, তথ্য সংগ্রহ স্বয়ংক্রিয় করতে যন্ত্রপাতিতে ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি) ডিভাইস ও ফ্লো মিটার স্থাপনসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিগত উন্নয়নে বড় অঙ্কের মূলধনী বিনিয়োগ প্রয়োজন। লক্ষ্যভিত্তিক অর্থায়ন ছাড়া অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের পক্ষে এই বিনিয়োগ করা সম্ভব নয়।
শীর্ষস্থানীয় তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান এপিলিয়ন গ্রুপের এক প্রতিনিধি তাদের বিপুলসংখ্যক কাঁচামাল সরবরাহকারীর কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহের বিষয়টি তুলে ধরে বলেন, "আপস্ট্রিম সরবরাহকারীদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ।"
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশি সরবরাহকারীরা ২০২৭ সালের পরও ডিপিপি ব্যবস্থা বাস্তবায়নের সময়সীমা বাড়ানোর জন্য ইইউর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, পশ্চিমা ভোক্তারা যে পণ্য কিনছেন, তার পেছনে থাকা সাপ্লাই চেইন সম্পর্কে দিন দিন আরও সচেতন হয়ে উঠছেন। ফলে পণ্যের কার্বন ফুটপ্রিন্ট এবং কাঁচামাল কোথায় থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে—এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে ভোক্তারা কেনাকাটার সিদ্ধান্ত নেওয়ার সম্ভাবনা বাড়ছে।
তারা আরও বলেন, দূষণকারী কিংবা যেসব পণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহ চেইনের তথ্য সঠিকভাবে শনাক্ত বা যাচাই করা যায় না, সেসব পণ্যের ব্যয় বেড়ে যায়। অন্যদিকে, তুলনামূলকভাবে পরিচ্ছন্ন ও পরিবেশবান্ধব পণ্য আরও সাশ্রয়ী হতে পারে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আতাউর রহমান খান বলেন, "ট্রেসেবিলিটিই এমন একটি মূল চালিকাশক্তি, যা নিয়ন্ত্রক ঝুঁকিকে স্বতন্ত্র বাজারসুবিধায় রূপান্তর করতে পারে।"
তিনি বলেন, "ফাইবার থেকে শুরু করে খুচরা পর্যায়ের পোশাক পর্যন্ত যাচাইযোগ্য তথ্য সংরক্ষণ করা গেলে বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলো পুরো সাপ্লাই চেইন সম্পর্কে আস্থা পাবে। এতে নিয়ন্ত্রক বাধ্যবাধকতা একটি কৌশলগত বাণিজ্যিক সম্পদে পরিণত হবে।"
তিনি কারখানা মালিক ও নেতাদের ডিজিটাল ট্রেসেবিলিটিকে প্রশাসনিক বোঝা হিসেবে না দেখে কৌশলগত বাজারসুবিধা হিসেবে বিবেচনা করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তৈরি পোশাক খাতকে ভবিষ্যতের চাহিদার উপযোগী করে তুলতে এবং পরীক্ষামূলক সমাধানগুলো সারা দেশে সম্প্রসারণে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিশ্রুতির কথা জানান।
তিনি আরও বলেন, "বাংলাদেশকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু দাম, মান ও সময়মতো পণ্য সরবরাহের ওপর নির্ভর করলে হবে না; এর সঙ্গে সার্কুলারিটি এবং যাচাই করা পণ্যের উৎসকেও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।"
