এমআরটি লাইন-১ ও ৫: বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণে ৫৮,৪৭৮ কোটি টাকার ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদন
ঢাকা ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি) উন্নয়ন প্রকল্পের লাইন-১ ও লাইন-৫-এর ভূগর্ভস্থ ও উড়ালপথ, স্টেশন, ডিপো, ট্র্যাক এবং বৈদ্যুতিক ও সংকেত ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণে ৫৮ হাজার ৪৭৭ কোটি ৭১ লাখ টাকার ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদন করেছে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি।
আজ বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে কমিটির বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে এ সংক্রান্ত আটটি প্রস্তাব অনুমোদন দেওয়া হয়।
এর মধ্যে লাইন-১–এর চারটি এবং লাইন-৫ এর একটি প্যাকেজের পূর্তকাজের ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদন হয়েছে। পাশাপাশি লাইন-১-এর আরও দুটি এবং লাইন-৫ উত্তর রুটের একটি প্যাকেজের ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে।
বৈঠকে ঢাকা ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট উন্নয়ন (লাইন-১) প্রকল্পের প্যাকেজ সিপি-২, সিপি-৬, সিপি-৯ ও সিপি-১০ এবং লাইন-৫-এর সিপি-৩ প্যাকেজের পূর্ত কাজের ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হয়। পাশাপাশি লাইন-১-এর সিপি-৪ ও সিপি-৭ এবং লাইন-৫ উত্তর রুটের সিপি-২-এর ক্রয় প্রস্তাবও অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করা হয়।
প্রকল্প–সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, লাইন-১ ও লাইন-৫ দুই প্রকল্পের প্রথম সংশোধিত প্রকল্প একনেক গত ১৬ সেপ্টেম্বর অনুমোদন করে। উভয় প্রকল্পের মেয়াদ ১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ থেকে ৩১ ডিসেম্বর, ২০৩৩ সাল পর্যন্ত। এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)। বাংলাদেশ সরকার ও জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা যৌথভাবে প্রকল্পগুলোতে অর্থায়ন করছে।
মন্ত্রি পরিষদ বিভাগের থেকে জানানো হয়, সভায় লাইন-১ প্রকল্পের আওতায় ডিপোতে সিভিল ও বিল্ডিং কাজ (সিপি-০২) প্যাকেজের জন্য প্রায় ৪ হাজার ২৮৫ কোটি টাকার প্রস্তাব অনুমোদনের সুপারিশ করা হয়েছে। এ কাজে সুপারিশকৃত দরদাতা হচ্ছে সিনোহাইড্রো-এসইবিসিএল জেভি।
লাইন-১-এর সিপি-০৬ প্যাকেজের আওতায় বাড্ডা স্টেশনের উত্তরাংশ থেকে বিমানবন্দর স্টেশন পর্যন্ত ৫.১৮২ কিলোমিটার ভূগর্ভস্থ পথ নির্মাণ করা হবে। এর মধ্যে দুটি ৪.১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ সুড়ঙ্গ ও তিনটি ভূগর্ভস্থ স্টেশন থাকবে। স্টেশন তিনটি হলো বিমানবন্দর, বিমানবন্দর টার্মিনাল-৩ ও খিলক্ষেত স্টেশন।
এ কাজের জন্য ভ্যাট ও করসহ ব্যয় হবে ১১ হাজার ৫৯০ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। এই প্যাকেজের জন্য জাপানের নিশিমাতসু, টিপিএল ও টোডার যৌথ উদ্যোগকে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে সুপারিশ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, ট্র্যাক ও বৈদ্যুতিক সুবিধা সংক্রান্ত সিপি-০৯ প্যাকেজের জন্য ১১ হাজার ৬৫ কোটি টাকার ক্রয় প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে। সর্বনিম্ন দরদাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে এলঅ্যান্ডটি-সুমিতোমো কনসোর্টিয়াম (এলটিএসসি) এই প্যাকেজের জন্য নির্বাচিত হয়েছে।
সিপি-১০ প্যাকেজে থাকবে সংকেত ও টেলিযোগাযোগব্যবস্থা, প্ল্যাটফর্মের পর্দা-দরজা এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা। এতে যোগাযোগভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় ট্রেন নিয়ন্ত্রণ, অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক ও এলটিইভিত্তিক বেতার যোগাযোগব্যবস্থা থাকবে।
এ কাজের ব্যয় ৬ হাজার ৪৪৬ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। ভারতের লারসেন অ্যান্ড টুব্রোকে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে সুপারিশ করা হয়েছে। তাদের দর সরকারি প্রাক্কলনের চেয়ে ৫০.৮৯ শতাংশ বেশি।
লাইন-১-এর সিপি-০৪ প্যাকেজে রামপুরা স্টেশনের উত্তর প্রান্ত থেকে নতুনবাজার স্টেশন পর্যন্ত প্রধান লাইন ও স্টেশন নির্মাণ হবে। এর মূল চুক্তিমূল্য ১৮ হাজার ৩৭ কোটি ২৬ লাখ টাকা। জাপানের টোকিউ-মিল যৌথ উদ্যোগকে দরদাতা হিসেবে সুপারিশ করা হয়েছে।
সিপি-০৭ প্যাকেজে ট্রানজিশন থেকে বালু নদের শুরু পর্যন্ত ৫ দশমিক শূন্য শূন্য ৭ কিলোমিটার প্রধান লাইন ও স্টেশন নির্মাণ করা হবে। মূল চুক্তিমূল্য ২ হাজার ৫৩৪ কোটি টাকা। কাজটি পেতে পারে সিআরইসি-মিল-এমবিইসি যৌথ উদ্যোগ।
লাইন-৫ উত্তর রুটের সিপি-০২ প্যাকেজে ডিপোর পূর্ত ও ভবন নির্মাণ করা হবে। মূল চুক্তিমূল্য ১ হাজার ৮৪৮ কোটি টাকা। কনকর্ড প্রগতি কনসোর্টিয়াম ও হ্যানিল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশনের যৌথ উদ্যোগকে দরদাতা হিসেবে সুপারিশ করা হয়েছে।
একইভাবে লাইন-৫ নর্দান রুট প্রকল্পের আওতায় হেমায়েতপুর থেকে আমিনবাজার এবং নতুন বাজার হয়ে ভাটারা পর্যন্ত এলিভেটেড অংশে মূল লাইন ও পাঁচটি স্টেশন নির্মাণ (সিপি-০৩) প্যাকেজের জন্য প্রায় ২ হাজার ৬৭০.৯৮ কোটি টাকার প্রস্তাব অনুমোদনের সুপারিশ করেছে কমিটি।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব প্যাকেজ অনুমোদিত হলে রাজধানীর মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক দ্রুত সম্প্রসারণ পাবে এবং যানজট নিরসনে বড় ধরনের অগ্রগতি সম্ভব হবে।
মেট্রোরেল লাইন-১ ও লাইন-৫ নর্দান রুট
ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনতে নির্মাণাধীন এমআরটি লাইন-১ প্রকল্পটি দুটি অংশে বাস্তবায়ন হচ্ছে। এর একটি অংশ বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত ১৯.৮৭২ কিলোমিটার দীর্ঘ পাতাল রুট, যেখানে ১২টি আন্ডারগ্রাউন্ড স্টেশন থাকবে। অন্য অংশটি নতুন বাজার থেকে পিতলগঞ্জ ডিপো পর্যন্ত ১১.৩৬৯ কিলোমিটার দীর্ঘ, যেখানে উড়াল ও পাতাল মিলিয়ে মোট ৯টি স্টেশন নির্মিত হচ্ছে।
সব মিলিয়ে এমআরটি লাইন-১ এর মোট দৈর্ঘ্য ৩১.২৪১ কিলোমিটার। এটি ১২টি আলাদা প্যাকেজের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, এই প্রকল্পের বিমানবন্দর রুটেই দেশের প্রথম পাতাল মেট্রোরেল নির্মিত হচ্ছে।
অন্যদিকে, এমআরটি লাইন-৫ নর্দান রুট প্রকল্পটি হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ হবে। এর মধ্যে ১৩.৫০ কিলোমিটার অংশ পাতাল এবং ৬.৫০ কিলোমিটার অংশ উড়াল। এই রুটে মোট ১৪টি স্টেশন থাকবে, যার মধ্যে ৯টি পাতাল এবং ৫টি উড়াল স্টেশন।
