আন্তর্জাতিক মূল্যায়নের আগে অর্থপাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন রোধে সংস্কার জোরদার করছে বাংলাদেশ
অর্থপাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধে সক্ষমতা যাচাইয়ে ২০২৭ সালে আন্তর্জাতিক মূল্যায়নের মুখোমুখি হবে বাংলাদেশ। এশিয়া প্যাসিফিক গ্রুপ অন মানি লন্ডারিং (এপিজি) চতুর্থ দফায় বাংলাদেশের মিউচ্যুয়াল ইভ্যালুয়েশন করবে।
এ মূল্যায়নে ভালো ফল করতে আইনগত কাঠামো, তদন্ত, বিচার এবং বাস্তব প্রয়োগে দেশের সক্ষমতা তুলে ধরতে এখন থেকেই জোর প্রস্তুতি শুরু করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে সরকার।
এর অংশ হিসেবে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে জাতীয় ঝুঁকি মূল্যায়নের (ন্যাশনাল রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট) কাজ চলছে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে এ মূল্যায়ন শেষ করে ঝুঁকি মোকাবিলার জাতীয় কৌশল চূড়ান্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এছাড়া আগামী ১১ থেকে ১৩ আগস্ট এপিজির একটি প্রি-ইভ্যালুয়েশন দল ঢাকা সফরে এসে সরকারের প্রস্তুতি পর্যালোচনা করবে।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) অর্থ মন্ত্রণালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মানি লন্ডারিং ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধবিষয়ক জাতীয় সমন্বয় কমিটির (এনসিসি) বৈঠকে এসব বিষয়ে আলোচনা ও প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয় বলে বৈঠকে উপস্থিত একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
পাঁচ খাতে ঝুঁকি মূল্যায়ন
এপিজির মূল্যায়নের আগে বাংলাদেশ পাঁচটি খাতে জাতীয় ঝুঁকি মূল্যায়ন করছে। এগুলো হলো—অর্থ পাচার (মানি লন্ডারিং); সন্ত্রাসে অর্থায়ন; ব্যাপক ধ্বংসাত্মক অস্ত্রের বিস্তারসংক্রান্ত অর্থায়ন (প্রলিফারেশন ফাইন্যান্সিং); এনজিও বা অলাভজনক সংস্থার (এনপিও) মাধ্যমে অর্থপাচারের ঝুঁকি; ভার্চুয়াল অ্যাসেট, ক্রিপ্টোকারেন্সি ও ডিজিটাল লেনদেনসংক্রান্ত ঝুঁকি।
মানি লন্ডারিং-সংক্রান্ত ঝুঁকি মূল্যায়নে নেতৃত্ব দিচ্ছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। সন্ত্রাসে অর্থায়নের ঝুঁকি মূল্যায়ন করছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বাধীন কমিটি ও পুলিশের অ্যান্টি টেরোরিজম ইউনিট। এনজিও খাত, ভার্চুয়াল অ্যাসেট ও ডিজিটাল লেনদেনসংক্রান্ত মূল্যায়নের দায়িত্বে রয়েছে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)। আর প্রলিফারেশন ফাইন্যান্সিংয়ের ঝুঁকি নিরূপণ করছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বাধীন কমিটি।
বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, এসব মূল্যায়নের কাজ ইতোমধ্যে ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। ডিসেম্বরের মধ্যে প্রতিবেদন চূড়ান্ত হওয়ার পর ঝুঁকি মোকাবিলায় জাতীয় কৌশলপত্র প্রণয়ন করা হবে।
সূত্রগুলো জানায়, ঝুঁকি মোকাবিলার অন্যতম প্রধান কৌশল হবে আর্থিক লেনদেন আরও বেশি ডিজিটাল করা। সব লেনদেন ডিজিটাল হলে অর্থের উৎস, গন্তব্য ও প্রবাহ সহজে শনাক্ত করা সম্ভব হবে। এ লক্ষ্যেই বাংলা কিউআর কোডসহ বিভিন্ন ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।
আগস্টে আসছে এপিজির প্রি-ইভ্যালুয়েশন দল
আগামী ১১ থেকে ১৩ আগস্ট এপিজির একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফর করবে। সফরে তারা জাতীয় সমন্বয় কমিটি, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের নেতৃত্বাধীন ওয়ার্কিং কমিটি এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোর সঙ্গে বৈঠক করবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বৈঠকে উপস্থিত এক কর্মকর্তা বলেন, "এটি মূল মূল্যায়নের আগের প্রস্তুতিমূলক ধাপ। এপিজির প্রতিনিধিরা বাংলাদেশের প্রস্তুতি, অগ্রাধিকারমূলক পদক্ষেপ এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সক্ষমতা সম্পর্কে ধারণা নেবেন। তাই সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে।"
তিনি জানান, আগামী বছরের মার্চে এপিজির মূল্যায়নকারী দলের কাছে বাংলাদেশের জাতীয় ঝুঁকি মূল্যায়ন প্রতিবেদন, জাতীয় কৌশলপত্র এবং আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোসংক্রান্ত তথ্য পাঠানো হবে। এরপর ভার্চুয়াল বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। ২০২৭ সালের অক্টোবরে মূল্যায়নকারী দল বাংলাদেশ সফর করে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে পৃথক সাক্ষাৎকার নেবে।
মূল্যায়নে কী দেখা হবে
এপিজির মূল্যায়ন হবে ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্সের (এফএটিএফ) নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসারে। এতে দুটি বিষয় সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে—বাংলাদেশের আইন ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণ করছে কি না (টেকনিক্যাল কমপ্লায়েন্স) এবং সেই আইন বাস্তবে কতটা কার্যকরভাবে প্রয়োগ হচ্ছে (ইফেকটিভনেস)।
বৈঠকে উপস্থিত এক সচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, "শুধু আইন থাকলেই হবে না। সন্দেহজনক লেনদেন শনাক্ত হওয়ার পর তদন্ত হয়েছে কি না, মামলা হয়েছে কি না, সম্পদ জব্দ করা গেছে কি না এবং অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা হয়েছে কি না—এসবই মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হবে।"
সংস্কার ও পাচার হওয়া সম্পদ উদ্ধারে তৎপরতা
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রকাশিত অর্থনীতি বিষয়ক শ্বেতপত্রে বাংলাদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচারের তথ্য তুলে ধরা হয়েছিল। পরে বর্তমান সরকারও জাতীয় সংসদে বিভিন্ন প্রশ্নোত্তরে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ, সম্পদ উদ্ধারের উদ্যোগ এবং অগ্রাধিকারভিত্তিক মামলার তথ্য প্রকাশ করেছে। ফলে আন্তর্জাতিক মূল্যায়নকারী সংস্থাগুলোর কাছে বাংলাদেশের অর্থপাচারের ঝুঁকি ও অতীতের দুর্বলতা এখন আর অজানা নয়।
তবে কর্মকর্তারা মনে করেন, এপিজি শুধু অর্থপাচারের ঘটনা ঘটেছে কি না, তা নয়; বরং এসব ঘটনা প্রতিরোধ ও মোকাবিলায় সরকার কতটা কার্যকর ও আন্তরিক পদক্ষেপ নিয়েছে, সেটিও সমান গুরুত্ব দিয়ে মূল্যায়ন করবে।
এ কারণে সরকার মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, কোম্পানি আইনসহ বিভিন্ন আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি প্রকৃত সুবিধাভোগী মালিকানা (বেনিফিশিয়াল ওনারশিপ) প্রকাশের বিধান যুক্ত করা এবং যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরের (আরজেএসসি) সক্ষমতা বাড়ানোর কাজ চলছে।
একই সঙ্গে যৌথ তদন্ত দল গঠন, অগ্রাধিকারভিত্তিতে ১১টি অর্থপাচারের মামলা তদন্ত, সম্পদ জব্দ এবং বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ও সম্পদ উদ্ধারে আন্তর্জাতিক আইন ও নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান নিয়োগসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
কর্মকর্তারা জানান, বিদেশে পাচার হওয়া সম্পদ উদ্ধারে সরকার দ্বিমুখী কৌশল অনুসরণ করছে। এর মধ্যে অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) নেতৃত্বে ফৌজদারি তদন্ত এবং আন্তর্জাতিক আইন ও ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় দেওয়ানি কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
এ পর্যন্ত আটটি ব্যাংক ১২টি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে গোপনীয়তা চুক্তি (নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট) সই করেছে। এর মধ্যে দুটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম পরিচালনার চুক্তিও (এনগেজমেন্ট অ্যাগ্রিমেন্ট) সম্পন্ন হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠান 'সম্পদ উদ্ধার না হলে কোনো পারিশ্রমিক নয়' (No Recovery, No Fee) ভিত্তিতে কাজ করবে। অর্থাৎ, সম্পদ উদ্ধার সম্ভব হলেই তারা পারিশ্রমিক পাবে।
বৈঠকে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময় এবং বিদেশে থাকা অবৈধ সম্পদ উদ্ধারের অগ্রগতিও পর্যালোচনা করা হয়।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এ মূল্যায়ন
কর্মকর্তারা বলেন, এপিজির মূল্যায়নে বাংলাদেশ খারাপ ফল করলে দেশের আর্থিক ব্যবস্থার ওপর আন্তর্জাতিক আস্থা কমে যেতে পারে। এতে বিদেশি বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ব্যয়ও বাড়তে পারে।
এছাড়া ঋণপত্র (এলসি) খোলা এবং আন্তসীমান্ত আর্থিক লেনদেন পরিচালনার ক্ষেত্রে ব্যাংক ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে আরও কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের মুখে পড়তে হতে পারে, যা তাদের পরিপালন ব্যয় (কমপ্লায়েন্স কস্ট) বাড়িয়ে দেবে।
