বিদ্যুৎ সরবরাহ পর্যাপ্ত, তবে পিক আওয়ারে সাময়িক বিভ্রাট থাকছে: বিদ্যুৎমন্ত্রী
দেশে বিদ্যুতের সামগ্রিক কোনো ঘাটতি নেই বলে জাতীয় সংসদকে জানিয়েছেন বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ। তিনি বলেন, গ্রীষ্মকাল ও সেচ মৌসুমে জ্বালানি সংকট, সঞ্চালন সীমাবদ্ধতা এবং প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে সাময়িক কিছু বিভ্রাট ঘটলেও বর্তমানে দেশ বিদ্যুতের চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম।
রবিবার (৭ জুন) জাতীয় সংসদে কুমিল্লা-৯ আসনের বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য আবুল কালামের এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এসব কথা বলেন।
মন্ত্রী জানান, গ্রীষ্ম ও সেচ মৌসুমে দেশে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা থাকে প্রায় ১৮,০০০ মেগাওয়াট। বর্তমানে দেশে চাহিদার তুলনায় পর্যাপ্ত উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে। তবে প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহে সীমাবদ্ধতা, সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামো, রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রম এবং ঝড়ের কারণে মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ সরবরাহে সাময়িক বিঘ্ন ঘটে।
তিনি বলেন, 'এসব ক্ষেত্রে চাহিদা অনুযায়ী সব সময় সরবরাহের মান বজায় রাখা সম্ভব হয় না।'
প্রশ্নোত্তর পর্বে যশোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ গোলাম রসুল গ্রামীণ এলাকায় ৫ থেকে ৭ ঘণ্টা লোডশেডিং এবং নওয়াপাড়া শিল্পাঞ্চলে বিদ্যুৎ সংকটের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। এর জবাবে মন্ত্রী দাবি করেন, দেশে বর্তমানে বিদ্যুতের কোনো ঘাটতি নেই। ঝড়, গাছ উপড়ে পড়া বা সঞ্চালন লাইনের ত্রুটির কারণে সৃষ্ট বিভ্রাটকে 'লোডশেডিং' হিসেবে গণ্য করা ঠিক নয়। মন্ত্রী বলেন, 'লোডশেডিং মানে বিদ্যুতের সংকট। বর্তমানে বাংলাদেশে বিদ্যুতের কোনো সংকট নেই।'
সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নিলুফার চৌধুরী মনির এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী জানান, দেশে গ্রিড-ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বর্তমানে ২৮,৯১৯ মেগাওয়াট। ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে সরকার জীবাশ্ম জ্বালানি ও নবায়নযোগ্য শক্তি উভয়কেই সমান গুরুত্ব দিচ্ছে। বর্তমানে ৭,৯২৮ মেগাওয়াট ক্ষমতার ৩২টি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণাধীন রয়েছে। এছাড়া ৬৬৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার ১৫টি নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প বর্তমানে দরপত্র পর্যায়ে রয়েছে, যা ২০৩০ সালের মধ্যে চালু হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
মন্ত্রী আরও জানান, দেশের শতভাগ মানুষকে ইতিমধ্যে বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় আনা হয়েছে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে সবার জন্য নিরবচ্ছিন্ন ও মানসম্মত বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করে যাচ্ছে।
জামায়াত দলীয় সংসদ সদস্য গোলাম রসুলের এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, 'তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে বিদ্যুতের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, তবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার আগাম পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। ২০২৬ সালের সম্ভাব্য চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন পরিকল্পনা সমন্বয় করা হয়েছে। গ্যাস, কয়লা ও তরল জ্বালানিসহ পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।'
তিনি যোগ করেন, গ্যাস, কয়লা ও তরল জ্বালানিভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ কাজ পরিকল্পিতভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে যাতে সর্বোচ্চ উৎপাদন নিশ্চিত করা যায়। ফলে উৎপাদন ঘাটতির কারণে কোনো লোডশেডিংয়ের প্রয়োজন হচ্ছে না।
বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্য খায়রুল কবির খোকনের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করে বিদ্যমান বিতরণ অবকাঠামো ব্যবহার করতে পারেন অথবা বড় গ্রাহকদের কাছে সরাসরি বিদ্যুৎ বিক্রি করতে পারেন। বর্তমানে দেশে ১,১৭২ মেগাওয়াট ক্ষমতার ২৬টি নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে এবং আরও ১৫টি প্রকল্প ২০২৯ সালের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে।
ঢাকা-১ আসনের সংসদ সদস্য খন্দকার আবু আশফাকের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বর্তমান বিদ্যুতের চাহিদা ১৬,৫০০ থেকে ১৭,৫০০ মেগাওয়াটের মধ্যে, আর উৎপাদন পরিস্থিতি অনুযায়ী ১৫,৫০০ থেকে ১৭,২০০ মেগাওয়াটের মধ্যে উঠানামা করছে।
শেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য রাশেদুল ইসলাম রাশেদ দক্ষিণ এশিয়া জুড়ে সম্ভাব্য দীর্ঘস্থায়ী দাবদাহের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলে মন্ত্রী বলেন, সরকার যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত রয়েছে। তবে প্রয়োজনে নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় সীমিত পর্যায়ে লোডশেডিং করার প্রয়োজন হতে পারে।
খুলনা-২ আসনের সংসদ সদস্য জাহাঙ্গীর হোসেন হেলালের এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী জানান, রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হচ্ছে। রূপসায় দুটি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র গ্যাস সংকটের কারণে বন্ধ থাকলেও ভোলা থেকে গ্যাস সরবরাহ করে সেগুলো চালুর চেষ্টা চলছে। মন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, এই কেন্দ্রগুলো চালু হলে খুলনায় আর কোনো বিদ্যুৎ সংকট থাকবে না।
বগুড়া-১ আসনের সংসদ সদস্য কাজী রফিকুল ইসলাম চরাঞ্চলসহ দুর্গম এলাকায় বিদ্যুতায়ন সম্পর্কে জানতে চাইলে মন্ত্রী বলেন, গ্রিড সম্প্রসারণ ব্যয়বহুল হলেও পর্যায়ক্রমে এসব এলাকায় বিদ্যুতায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। মৌলভীবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান চৌধুরীকে জানানো হয়, দুর্গম পাহাড়ি এলাকা ও খাসিয়া পুঞ্জিগুলোতে সোলার প্যানেল এবং ব্যাটারি-ভিত্তিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সবশেষে পটুয়াখালী-২ আসনের সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলামের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, পল্লী বিদ্যুৎ নেটওয়ার্কে ট্রান্সফরমার চুরি রোধ করা কঠিন। তিনি স্থানীয় জনগণকে এ ব্যাপারে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান এবং ট্রান্সফরমার সরবরাহে বিলম্বের অভিযোগ তদন্তের আশ্বাস দেন।
