নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে গ্রাফিতি আঁকতে গিয়ে পুলিশের সঙ্গে ‘জুলাই যোদ্ধা’দের ধস্তাধস্তি
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) জারি করা নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে গ্রাফিতি আঁকতে গেলে 'জুলাই যোদ্ধা' ব্যানারের কর্মীদের সঙ্গে পুলিশের ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটেছে। সোমবার (১৮ মে) চট্টগ্রামে এ ঘটনা ঘটে।
দুপুর ১টার দিকে নগরীর টাইগার পাস এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শী ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, পুলিশ প্রথমে ওই কর্মীদের এলাকা ছেড়ে যেতে নির্দেশ দেয়। একপর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে বাকবিতণ্ডা শুরু হয়, যা পরে শারীরিক ধস্তাধস্তিতে রূপ নেয়। ঘটনাস্থলে কিছুক্ষণ উত্তেজনা বিরাজ করলেও পরে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
এ বিষয়ে সিএমপি'র উপ-কমিশনার (উত্তর) আমিরুল ইসলাম বলেন, 'আগে থেকেই ওই এলাকায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা ছিল। অন্য যে কোনো জায়গায় তারা আঁকতে পারে, কিন্তু এখানে যেহেতু বিধিনিষেধ আছে, তাই আমরা তাদের সরিয়ে দিয়েছি। যারা আইনশৃঙ্খলার জন্য হুমকিস্বরূপ ছিল জনস্বার্থে তাদের পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর অভিভাবকদের ডেকে তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।'
এর আগে, গ্রাফিতি ইস্যুকে কেন্দ্র করে আন্দোলনকারী এবং বিএনপির পাল্টাপাল্টি কর্মসূচির জেরে নগরীর জিইসি মোড় থেকে দেওয়ানহাট এবং আশপাশের এলাকায় সব ধরনের সভা-সমাবেশ ও মিছিল-মিটিং নিষিদ্ধ ঘোষণা করে সিএমপি।
মূলত গত রোববার ওয়াসিম আকরাম উড়ালসড়কের পিলারে আঁকা জুলাই অভ্যুত্থানের শিল্পকর্মের ওপর সাদা ও হলুদ রং লেপে দেওয়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিতর্কের সূত্রপাত হয়। এনসিপির অভিযোগ, কর্তৃপক্ষ অভ্যুত্থানের স্মৃতিচিহ্ন মুছে ফেলার চেষ্টা করছে। তবে সিটি কর্পোরেশন এই অভিযোগ অস্বীকার করে জানায়, কোনো গ্রাফিতি নয়, কেবল পোস্টারগুলোই অপসারণ করা হয়েছে।
রোববার জারি করা এক গণবিজ্ঞপ্তিতে সিএমপি জানায়, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা বলবৎ থাকবে। সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী স্বাক্ষরিত ওই বিজ্ঞপ্তিতে জননিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়। নির্দেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ারও সতর্কতা দেওয়া হয়।
এই বিরোধের কেন্দ্রবিন্দু ছিল চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) টাইগারপাস কার্যালয় সংলগ্ন এলাকায় গ্রাফিতি আঁকার পরিকল্পনা। গত রোববার মধ্যরাতে টাইগারপাস থেকে লালখান বাজার সড়কে মেয়রের মিডিয়া সেল গ্রাফিতি আঁকার কর্মসূচির ঘোষণা দেয়। একই সময়ে ও একই স্থানে 'জুলাই যোদ্ধা' ব্যানারে পৃথক গ্রাফিতি কর্মসূচির ঘোষণা দেন আন্দোলনকারী ও শিক্ষার্থীরা।
ওইদিন রাতেই কর্মীরা সিটি কর্পোরেশন কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ করেন এবং পুনরায় গ্রাফিতি আঁকা শুরু করেন। একই সময়ে সেখানে বিএনপি কর্মীরাও জড়ো হলে দুই পক্ষের মধ্যে মুখোমুখি অবস্থান তৈরি হয় এবং পুরো এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়।
অভিযোগ 'ডাহা মিথ্যা' বললেন মেয়র
এদিকে, জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের গ্রাফিতি মুছে ফেলার অভিযোগকে 'ডাহা মিথ্যা' ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মন্তব্য করেছেন চসিক মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। সোমবার (১৮ মে) বিকেলে টাইগারপাসে নিজ কার্যালয়ে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
মেয়র বলেন, 'জুলাই আন্দোলনের গ্রাফিতি মুছে ফেলার জন্য আমি কখনো নির্দেশ দিইনি এবং ভবিষ্যতেও দেব না। নগরীর সৌন্দর্যবর্ধনের অংশ হিসেবে চসিকের পরিচ্ছন্নতা বিভাগ নিয়মিতভাবে বিভিন্ন পিলার ও দেয়াল থেকে পোস্টার-ব্যানার অপসারণ করে থাকে। টাইগারপাসে যেখানে রং করা হয়েছে, সেটি পোস্টারে ঢাকা ছিল; দৃশ্যমান কোনো গ্রাফিতি সেখানে ছিল না।'
তিনি আরও বলেন, 'জুলাই-আগস্টের চেতনার বিরুদ্ধে যাওয়ার প্রশ্নই আসে না। আমি নিজে ১৭ বছর রাজপথে আন্দোলন করেছি। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে চট্টগ্রামে প্রথম শহীদ ওয়াসিম আকরাম আমারই অনুসারী ছিল।' অপরিচ্ছন্ন হাতের লেখার চেয়ে আর্ট কলেজের শিক্ষার্থীদের নিয়ে মানসম্মত গ্রাফিতি আঁকতে চাইলে কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে অর্থায়নের আশ্বাসও দেন তিনি।
আন্দোলনে আহতদের চিকিৎসা সহায়তার প্রসঙ্গ তুলে ধরে ডা. শাহাদাত বলেন, ৪ আগস্ট যখন অনেক হাসপাতাল আহতদের নিতে অনাগ্রহ দেখিয়েছিল, তখন তিনি নিজ উদ্যোগে আহতদের চিকিৎসা করান এবং পরে আর্থিক সহায়তাও প্রদান করেন। শহীদ পরিবারগুলোকেও অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সহযোগিতা করা হয়েছে বলে জানান তিনি।
আন্দোলনকারীদের কর্মসূচির বিষয়ে তিনি বলেন, 'সামনের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ফায়দা লুটতে এবং ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতেই একটি মহল এসব কাজ করছে।'
মেয়াদ প্রসঙ্গে তিনি জানান, আদালতের নির্দেশে আইনগতভাবে তিনি বৈধ মেয়র এবং বর্তমান আইনি কাঠামো অনুযায়ী তার মেয়াদ ২০২৯ সাল পর্যন্ত। তবে তিনি দ্রুত একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবি জানান। লালখান বাজার এলাকায় সৃষ্ট উত্তেজনাকর পরিস্থিতির বিষয়ে মেয়র জানান, সংঘর্ষ এড়াতে তিনি নিজেই ঘটনাস্থলে গিয়ে কর্মীদের সরিয়ে আনেন। তিনি বলেন, 'আমরা একটি নিরাপদ ও সুন্দর শহর গড়তে চাই। সাংঘর্ষিক কোনো কিছুর প্রতি আমরা আগ্রহী নই।'
