রূপপুর থেকে পদ্মা সেতু: মেগা প্রকল্পে ‘ব্যাপক দুর্নীতি’র চিত্র তুলে ধরলেন প্রধানমন্ত্রী
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প, কর্ণফুলী টানেল ও পদ্মা সেতুসহ বিভিন্ন মেগা প্রকল্পে 'ব্যাপক দুর্নীতি' ও অস্বাভাবিক ব্যয়ের তথ্য তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, 'অতীতের এসব অনিয়মের ঋণের বোঝা এখন দেশের ২০ কোটি মানুষের ওপর এসে পড়েছে।'
সোমবার (১১ মে) দুপুরে তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক সভায় তিনি মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) অডিট প্রতিবেদনের বিভিন্ন তথ্য উল্লেখ করে এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'বর্তমান সরকার স্বাভাবিকভাবে যখন দায়িত্বভার গ্রহণ করেছি, আমরা প্রায় প্রত্যেকটি সেক্টর খুব ভঙ্গুর অবস্থায় পেয়েছি। একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে যখন সরকার যাত্রা শুরু করে, সেরকম একটা অবস্থার মধ্যে আমরা এই দেশটিকে পেয়েছি।'
তিনি বলেন, 'বর্তমানে দায়িত্বে থাকার কারণে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বাস্তব পরিস্থিতি জানার সুযোগ হচ্ছে। কয়েকদিন আগে মহা হিসাব- নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বিভিন্ন অডিট রিপোর্টের বিষয় তুলে ধরেন।'
তারেক রহমান বলেন, 'এটি আমি রাজনৈতিকভাবে উপস্থাপন করছি না, আমি বাস্তবতা তুলে ধরছি। আমি কাউকে রাজনৈতিকভাবে দোষারোপ করছি না। এদেশের নাগরিক আমরা-আপনারা, আপনাদের সন্তানরা এদেশে বড় হচ্ছে, সেজন্যই আমি কথাগুলো তুলে ধরছি।'
অডিট প্রতিবেদনের কিছু তথ্য পরে সংবাদপত্রেও প্রকাশিত হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
রূপপুর প্রকল্পের ব্যয় নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'অডিটর জেনারেল সাহেবের অনেকগুলো কথায় আমি খুব আশ্চর্য হয়েছি। আগে পত্রিকায় পড়েছিলাম। স্বাভাবিকভাবে পত্রিকায় ওভাবে না দেখলেও অডিটর জেনারেল যেহেতু অডিট করেছেন, পরিষ্কারভাবে কথাগুলো ফুটে উঠেছে বা বেরিয়ে এসেছে।'
তিনি বলেন, 'রূপপুর প্রকল্পে বিদেশিদের জন্য ফুল-ফার্নিশড কোয়ার্টার নির্মাণ করা হয়। সেখানে একটি বালিশের দাম ধরা হয়েছে ৮০ হাজার টাকা।'
প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'আপনি একজন স্বাভাবিক মানুষ হিসেবে চিন্তা করতে পারেন, কখনো কোনো বালিশের দাম পৃথিবীতে ৮০ হাজার টাকা হতে পারে?'
তিনি আরও বলেন, 'সেখানে ফার্নিচার যেহেতু ছিল, ড্রেসিং টেবিল কেনা হয়েছে। এটি অডিটর জেনারেল সাহেবের কথা। যে ড্রেসিং টেবিল উনার ধারণা ৩০/৩৫ হাজার টাকা দাম, সেই তার দাম ধরা হয়েছে ৪ থেকে ৫ লাখ টাকা।'
গত ৫ মে বাংলাদেশের মহা হিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক মো. নূরুল ইসলাম প্রধানমন্ত্রীর কাছে ২০২১-২২ অর্থবছরের ৩৮টি অডিট রিপোর্ট জমা দেন।
রূপপুর প্রকল্পের মোট ব্যয় প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'এই রূপপুর প্রকল্পটি… সিমিলার (একইরকম) প্রকল্প আমাদের পাশের একটি দেশ করেছে। তাদের লেগেছে সম্ভবত ১৪ হাজার কোটি টাকার মতো। বাংলাদেশের রূপপুরে যে প্রকল্পটি করা হয়েছে, এটির খরচ আল্টিমেটলি খুব সম্ভবত দাঁড়িয়েছে ৯৬ হাজার কোটি টাকা।'
কর্ণফুলী টানেল প্রকল্প নিয়েও প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, টানেলের ওপারে 'খুব স্ট্যান্ডার্ড, বেশ লাক্সারিয়াস' অ্যাপার্টমেন্ট বা ভবন নির্মাণ করা হয়েছে, যার কোনো প্রয়োজন ছিল না। সেখানে কয়েকশো' কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।
তিনি বলেন, 'অডিট তদন্তে আরও উঠে এসেছে যে কর্ণফুলী টানেলে ঢোকা ও বের হওয়ার মুখে দুই পাশে গাছ লাগানোর কথা থাকলেও বাস্তবে কোনো গাছ পাওয়া যায়নি।'
প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'এই গাছের জন্য ৫০ কোটি টাকা তুলে নিয়ে চলে গিয়েছে।'
অতীত সরকারের দুর্নীতির উদাহরণ তুলে ধরে তিনি পিরোজপুর জেলার একটি ঘটনার কথাও উল্লেখ করেন।
তারেক রহমান বলেন, 'পিরোজপুরের তিনজন সংসদ সদস্য তার সঙ্গে দেখা করে এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ের অধীনে রাস্তা নির্মাণকাজ বন্ধ থাকার বিষয়টি তুলে ধরেন। পরে খোঁজ নিয়ে তিনি জানতে পারেন, শুধু এলজিআরডি মন্ত্রণালয় থেকেই কাগজে-কলমে প্রকল্প দেখিয়ে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে, কিন্তু কোনো কাজ হয়নি।'
তিনি বলেন, 'লিটিগেশন হওয়ার কারণে এসব কাজ বন্ধ হয়ে আছে। কীভাবে সমস্যার জট ছুটিয়ে মানুষের জন্য কাজ করা যায়, রাস্তাঘাট নির্মাণ করা যায়—সেটি নিয়ে আলোচনা হয়েছে।'
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, 'কথা প্রসঙ্গে তখন আমি জানতে পারলাম, আরও কয়েকটি ডিপার্টমেন্ট মিলিয়ে একটি জেলাতে ৬ হাজার কোটি টাকা নেই।'
অডিট তদন্ত প্রতিবেদনের এসব উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, 'এরকম আরও অনেক ঘটনা আছে। ঘটনাগুলো ঘটেছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে বাস্তবতাই। আমরা চাইলেও বাস্তবতাকে পাশ কাটাতে পারব না।'
পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাদের আবাসন, পরিবহন ও তথ্যপ্রযুক্তি ইউনিটসহ বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে সরকার আন্তরিক। কিন্তু অতীতের অনিয়ম ও অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে সীমাবদ্ধতার মুখে পড়তে হচ্ছে।
তিনি বলেন, 'আমরা কাজগুলো করতে চাইছি। কিন্তু এই যে চার গুণ দামে রূপপুর আণবিক পাওয়ার রিয়্যাক্টর তৈরি করা হলো, এটির যে ঋণ; সেটা শোধ করতে এখানে উপস্থিত প্রত্যেকটা মানুষের মাথার ওপরে ঋণ পড়েছে।'
পদ্মা সেতুর ব্যয়ের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, 'যমুনা ব্রিজ, পাশের দেশের ভূপেন হাজারিকা ব্রিজ ১৪/১৫ হাজার কোটি টাকার মধ্যে করা হয়েছে। আর পদ্মা সেতুর খরচ হয়েছে ৫৪ বা ৫৬ হাজার কোটি টাকা।'
তিনি আরও বলেন, 'আল্টিমেটলি তো এখানে উপস্থিত প্রত্যেকটা মানুষসহ ২০ কোটি মানুষের ওপরে এই ঋণের বোঝা এসে পড়ছে। আজকে যদি এই অপ্রয়োজনীয় খরচগুলো না হতো, তাহলে আপনাদেরসহ আর্মি বলেন, এয়ারফোর্স বলেন, নেভি বলেন, শিক্ষা বলেন, স্বাস্থ্য বলেন—প্রত্যেকটি ক্ষেত্রে আমরা আরও ভালো কিছু করতে পারতাম।'
এর আগে, আজ (সোমবার) সকালে তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের শাপলা সম্মেলন কেন্দ্রে পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন প্রধানমন্ত্রী।
তার আগে গতকাল সকালে রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স মাঠে বার্ষিক প্যারেডের উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে পুলিশ সপ্তাহ-২০২৬-এর আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী এবং পুলিশের মহাপরিদর্শক আলী হোসেন ফকির।
এ সময় পুলিশ বাহিনীর বিভিন্ন সমস্যা ও পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির বিষয়ে বক্তব্য দেন অতিরিক্ত মহাপুলিশ পরিদর্শক (সিআইডি) মোসলেহ উদ্দিন আহমদ, ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি রেজাউল করিম মল্লিক, অতিরিক্ত ডিআইজি রায়হান উদ্দিন খান ও আহম্মদ মুঈদ, ঢাকার সুপার শামীমা পারভীন এবং ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার হাসান মোহাম্মদ নাছের রিকাবদার।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর মুখ সচিব এবিএম আবদুস সাত্তার, প্রেস সচিব সালেহ শিবলী, অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমনসহ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
