জ্বালানি তেলের দামের প্যারাডাক্স: চড়া কর ডেকে আনছে ভর্তুকি
মার্চের বিশ্ববাজারের দর ও বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী, প্রতি লিটার অকটেনের আমদানি খরচ পড়ে ১০৫.৭৩ টাকা। সাম্প্রতিক সরবরাহ সংকট ও বিশ্ববাজারে মূল্যবৃদ্ধির জেরে দাম বাড়ানোর পর খুচরা পর্যায়ে প্রতি লিটার অকটেন এখন বিক্রি হচ্ছে ১৪০ টাকায়।
এর অর্থ হলো, ভোক্তারা প্রতি লিটারে আমদানি ব্যয়ের চেয়ে ৩৪.২৭ টাকা বেশি পরিশোধ করছেন। এই বাড়তি অর্থের মধ্যে ২৭.৫৭ টাকাই আমদানি শুল্ক, ভ্যাট, উন্নয়ন সারচার্জ, পরিবহন ব্যয় ও রাষ্ট্রায়ত্ত পরিবেশক সংস্থাগুলোর মুনাফা হিসেবে সরকারের কোষাগারে যাচ্ছে।
এর সাথে স্থানীয় পরিবহন খরচ ও ডিলারদের কমিশন যোগ করার পর প্রতি লিটারে মোট খরচ দাঁড়ায় ১৫১.৬১ টাকা—যা খুচরা বিক্রয়মূল্যের চেয়ে ১১.৬১ টাকা বেশি। সরকার এই বাড়তি অংশটিকেই ভর্তুকি হিসেবে গণ্য করছে।
এখান থেকেই তৈরি হচ্ছে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য: সরকার একদিকে লিটারপ্রতি ২৭.৫৭ টাকা কর ও চার্জ আদায় করছে, আবার অন্যদিকে ১১.৬১ টাকা ভর্তুকি দিচ্ছে।
অর্থনীতিবিদ ও সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান টিবিএসকে বলেন, 'এটি একটি যৌক্তিক প্রশ্ন তোলে যে, সরকার আদৌ অকটেনে ভর্তুকি দিচ্ছে কি না।'
পেট্রোলের ক্ষেত্রেও চিত্রটি অনেকটা একই রকম, যার দাম সাধারণত অকটেনের চেয়ে ৫ টাকা কম হয়ে থাকে।
তবে ডিজেলের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। গণপরিবহন, পণ্য পরিবহন, সেচ কাজ, নৌযান ও মাছ ধরার ট্রলারে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় এই জ্বালানি।
বিশ্ববাজারে দাম বাড়ার ফলে বর্তমানে ডিজেলের আমদানি ব্যয় লিটারপ্রতি ১৪৮.০৬ টাকা। এর সাথে শুল্ক, কর, পরিচালন ও পরিবেশন ব্যয় যোগ করলে মোট খরচ দাঁড়ায় ২০৩.৮৪ টাকায়। তবে সরকার ১৫ টাকা দাম বাড়ানোর পরও খুচরা বিক্রয় মূল্য ১১৫ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছে। ফলে প্রতি লিটারে সরকারকে ৮৮.৮৪ টাকারও বেশি ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। এই দামের মধ্যেও ৫৫.৭৮ টাকা (বা ৩৭ শতাংশ) কর ও অন্যান্য খরচ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
টিবিএসের সঙ্গে আলাপকালে বিশ্লেষক ও ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো বলেছে, জ্বালানি তেলের ওপর অতিরিক্ত করের বোঝার কারণেই এই 'ভর্তুকি'র প্রয়োজন পড়ছে; কারণ জ্বালানি তেল এখন সরকারের রাজস্ব আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। তারা বলছে, কর যদি সাময়িকভাবে কমানো বা মওকুফ করা হতো ও আমদানি খরচের সাথে শুধু পরিবেশন ব্যয় যোগ করা হতো, তাহলে অকটেন এখন অনেক কম দামে বিক্রি করা যেতে এবং কোনো ভর্তুকিরই প্রয়োজন পড়ত না।
ভারত, পাকিস্তানসহ এই অঞ্চলের প্রধান অর্থনীতিগুলো জনগণের ওপর বাড়তি দামের চাপ কমাতে জ্বালানি তেলের ওপর আরোপিত কর কমিয়ে দিয়েছে। ভারত প্রিমিয়াম গ্রেডের তেলের দাম সামান্য বাড়ালেও সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ডিজেল ও পেট্রোলের দাম অপরিবর্তিত রেখেছে।
পাকিস্তান জ্বালানি তেলের দাম বাড়ালেও ডিজেল ও পেট্রোলের ওপর থেকে অনেক ক্ষেত্রে কর মওকুফ বা হ্রাস করেছে। এছাড়া দেশটি বিভিন্ন শহরে বিনামূল্যে বাস সার্ভিস চালু করেছে এবং মোটরসাইকেল আরোহী ও কৃষকদের জন্য নগদ অর্থ সহায়তাও দিচ্ছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) বিদ্যুৎ খাতে কর কমানোর এবং ভোক্তাদের জন্য নির্দিষ্ট মেয়াদের সাময়িক সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা করছে। যুক্তরাষ্ট্রও গ্যাসোলিনের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব কমাতে কর ছাড় দিচ্ছে এবং দেশটির রাজনীতিবিদরা ফেডারেল ট্যাক্স—গ্যালনপ্রতি ১৮.৪ সেন্ট—মওকুফের আহ্বান জানাচ্ছেন।
বাংলাদেশে ১৯ এপ্রিল থেকে কার্যকর হওয়া মূল্যবৃদ্ধির ক্ষেত্রে এ ধরনের কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অভ বাংলাদেশ-এর (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা শামসুল আলম বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে খুচরা মূল্য বাড়ানোর পাশাপাশি বর্তমান ভ্যাট ও করের হার বজায় রাখা একটি 'শোষণমূলক পদ্ধতি'। এতে জনকল্যাণের চেয়ে রাজস্ব আদায়কেই বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে বলে মনে হয়।
দাম না বাড়ালে মাসে ভর্তুকি লাগত ২ হাজার ৭৬৪ কোটি টাকা
ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়ে যাওয়ায় এপ্রিলে যদি স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি অনুসরণ করা হতো, তবে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম হতো ১৫৫.৪৬ টাকা, অকটেনের ১৪৮.৯৩ টাকা ও পেট্রোলের ১৪৪.৯৩ টাকা।
২০২৩ সালে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) থেকে নেওয়া ঋণের শর্ত অনুসারে পরের বছর থেকে সরকার স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে প্রতি মাসে দাম সমন্বয় করা শুরু করে। তবে ৩১ মার্চ সরকার জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায়নি।
এই পদ্ধতিতে চলতি মাসের মূল্য নির্ধারণ করা হয় আগের মাসের আগের মাসের ২১ তারিখ থেকে পরবর্তী মাসের ২০ তারিখ পর্যন্ত 'প্ল্যাটস-ভিত্তিক' গড় বাজারদরের ওপর ভিত্তি করে। এ পদ্ধতিতে ডিজেল ও অকটেনের মূল্য নির্ধারণ করা হয়। আর পেট্রোলের মূল্য সব সময় অকটেনের চেয়ে ৪ টাকা কম নির্ধারণ করা হয়ে থাকে।
১৮ এপ্রিলের মূল্যবৃদ্ধির আগে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের প্রস্তুত করা এক ব্রিফিং অনুসারে, মূল্য সমন্বয়ের আগে সরকার প্রতি লিটার ডিজেলে প্রায় ৪৫ টাকা ও অকটেনে ২৯ টাকা ভর্তুকি দিয়ে আসছিল।
জ্বালানি বিভাগের প্রাক্কলন অনুসারে, ইরান যুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির পর দেশের বাজারে দাম অপরিবর্তিত থাকলে সরকারকে গড় চাহিদার ভিত্তিতে প্রতি মাসে ২ হাজার ৭৬৪ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হতো। এই বিশাল অঙ্কের মধ্যে ২ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা ব্যয় হতো ডিজেলে ও ১৪৫ কোটি টাকা অকটেনে; আর অবশিষ্ট টাকা লাগত পেট্রোল ও কেরোসিনের ভর্তুকিতে।
তবে ১৮ এপ্রিল জ্বালানির দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্তের ফলে মাসিক ভর্তুকির চাপ প্রায় ৮০০ কোটি টাকা কমে আসবে। অর্থাৎ দাম বাড়ার পরও সরকারকে প্রতি মাসে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা জ্বালানি ভর্তুকি দিতে হবে।
ডিজেলে বিপুল ভর্তুকির তুলনায় অকটেনে ভর্তুকি অনেক কম হওয়া সত্বেও অকটেনের দাম বেশি বাড়ানোর যুক্তি তুলে ধরে জ্বালানি বিভাগ বলেছে, এর মধ্য দিয়ে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভারসাম্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
মন্ত্রণালয় বলেছে, ডিজেল কৃষি কার্যক্রম, পরিবহন খাত, পণ্য পরিবহন, উৎপাদন কার্যক্রম ও সাধারণ মানুষের জীবীকা নির্বাহের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। অন্যদিকে অকটেনের ব্যবহার তুলনামূলক সীমিত এবং প্রধানত উচ্চ আয়ের গোষ্ঠীর ব্যবহারে অধিকতর কেন্দ্রীভূত।
তাই মূল্য সমন্বয়ের ক্ষেত্রে জনজীবন ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব বিবেচনায় ডিজেলের ওপর তুলনামুলক কম চাপ আরোপ এবং অকটেনের ক্ষেত্রে তুলনামুলক বেশি সমন্বয় নির্ধারণ একটি যৌক্তিক ও নীতিগত গ্রহণযোগ্য পন্থা হিসেবে বিবেচনা করেছে জ্বালানি বিভাগ।
বিকল্প পথ আছে
ইরান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে ইউরোপ-এশিয়ার বিভিন্ন দেশ তেলের ওপর থেকে শুল্কর কমিয়ে দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখার চেষ্টা করছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশ পাকিস্তানও জ্বালানির ওপর কর কমিয়েছে। তবে বাংলাদেশ তা না করায় ক্রেতা অনেক বেশি দামে তেল কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।
সেলিম রায়হান বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয়ের পরপরই পরিবহন ভাড়া ও অন্যান্য পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় এর প্রভাব সরাসরি সাধারণ মানুষের ওপর পড়েছে।
তিনি আরও বলেন, 'বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) জ্বালানি তেলের মূল্য থেকে একটি অংশ তাদের ডেভেলপমেন্ট ফান্ডে স্থানান্তর করে, যা মূলত ভোক্তার কাছ থেকেই সংগৃহীত অর্থ। এই অর্থ নেওয়া সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হলে মূল্যবৃদ্ধির চাপ কিছুটা কমানো যেত।
'একইভাবে, পেট্রোল পাম্প মালিকদের কমিশনের হার অপরিবর্তিত থাকলেও বিক্রির পরিমাণ বাড়ার ফলে তাদের মোট কমিশনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এক্ষেত্রেও একটি সীমা আরোপ বা সমন্বয় আনা সম্ভব ছিল। পাশাপাশি, পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর মতো কর কাঠামোতেও সাময়িক ছাড় বিবেচনা করা যেত।'
এই অর্থনীতিবিদ বলেন, 'আমার মতে, কর হ্রাস, বিপিসির ডেভেলপমেন্ট ফান্ডে অর্থ নেওয়া থেকে বিরতি এবং কমিশনের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ—এই তিনটি পদক্ষেপ একসঙ্গে বিবেচনা করলে সরকার তুলনামূলকভাবে সহনীয় একটি মূল্য সমন্বয় করতে পারত।
'এতে রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় কিছু চাপ তৈরি হলেও সাধারণ মানুষের ওপর সরাসরি প্রভাব কমানো যেত। বর্তমান পরিস্থিতিতে একটি স্বচ্ছ ও ভারসাম্যপূর্ণ মূল্য নির্ধারণ নীতি জরুরি, যেখানে ভোক্তাস্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি টেকসই সমাধানের দিকে এগোনো হবে।'
ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা শামসুল আলম বলেন, বাজার স্থিতিশীল রাখা, মূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রভাব কমানো ও ভোক্তাদের স্বস্তি দিতে জ্বালানি তেলের ভ্যাট ও কর কমানো একটি স্বীকৃত বৈশ্বিক চর্চা।
তিনি উল্লেখ করেন, 'বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়লেও আমাদের প্রকৃত আমদানি ব্যয় সরকারের দেখানো হিসাবের চেয়ে অনেক কম।'
শামসুল আলম মনে করেন, সরকার যখন চাহিদানুসারে পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন এ ধরনের মূল্য নির্ধারণ নীতি নাগরিকদের নায্যমূল্য পাওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে।
তিনি বলেন, জ্বালানি খাতকে মুনাফা অর্জনকারী খাত হিসেবে বিবেচনা করা ভোক্তাদের ভোগান্তিকে অবজ্ঞা করারই নামান্তর।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বৈশ্বিক সংকটের ধাক্কা বাংলাদেশ একাই সামলাচ্ছে না, তবে এই সংকট বিচক্ষণতার সঙ্গে মোকাবিলা করার ক্ষেত্রে দেশ প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে।
ক্যাবের সহসভাপতি এসএম নাজের হোসাইন বলেন, ভোক্তাদের এই চরম দুর্দশার মধ্যে জ্বালানি তেলের দাম না বাড়িয়ে সরকার সাময়িকভাবে শুল্ক মওকুফ করতে পারত।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, 'যদিও বাংলাদেশে সাম্প্রতিক জ্বালানি মূল্যের পরিবর্তন বৈশ্বিক চাপের একটি প্রতিক্রিয়া, তবে নীতিগত সিদ্ধান্তগুলো কিছু যৌক্তিক উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।'
এই অর্থনীতিবিদ বলেন, তেলের দাম বাড়ার তাৎক্ষণিক প্রভাব পড়ে পরিবহন ভাড়ার ওপর, যা নিম্ন ও মধ্য-আয়ের পরিবারগুলোকে সবচেয়ে বেশি বিপাকে ফেলে।
এর বদলে সরকার জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব কমাতে কিছু বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিতে পারত বলে তিনি মনে করেন। 'যেমন, সরকার সাময়িকভাবে জ্বালানি কর কমাতে পারত, ডিলারদের কমিশন আপাতত সীমিত রাখতে পারত এবং একান্ত প্রয়োজন না হলে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের ডেভেলপমেন্ট ফান্ডের অর্থ নেওয়া থেকে বিরত থাকতে পারত।'
তিনি আরও বলেন, এসব পদক্ষেপ হয়তো মূল্যবৃদ্ধি পুরোপুরি ঠেকাতে পারত না, তবে সাধারণ মানুষের চাপের বোঝা কিছুটা হলেও লাঘব করত।
ফাহমিদা খাতুন বলেন, বোধগম্যভাবেই সরকারের সীমিত আর্থিক সক্ষমতার কারণে দীর্ঘকাল বড় অঙ্কের ভর্তুকি দেওয়া সম্ভব নয়। 'তবে এই সমন্বয় প্রক্রিয়াটি আরও সতর্কতার সাথে করা যেত, যেখানে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে এই ভারটি আরও ন্যায্যভাবে ভাগ করে দেওয়া যেত। এতে জনগণের আস্থাও বাড়ত।'
উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও সাধারণ মানুষের কষ্টের কথা বিবেচনা করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ কর্মপন্থা গ্রহণ করা উচিত বলে উল্লেখ করেন ফাহমিদা। এছাড়া আর্থিক সমন্বয় ও জ্বালানি খাতের দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে দরিদ্রদের জন্য সুনির্দিষ্ট সহায়তা প্রদানের পরামর্শও দেন তিনি।
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বিভিন্ন দেশের পদক্ষেপ
ভারত ও পাকিস্তানের মতো আঞ্চলিক অর্থনীতিগুলো জনগণের ওপর চাপ কমাতে জ্বালানি কর হ্রাসের পথ বেছে নিয়েছে। প্রিমিয়াম গ্রেডের তেলের দাম লিটারে মাত্র ২ রুপি বাড়ানো ছাড়া ভারত মাদাগাস্কারের মতো হাতেগোনা কয়েকটি দেশের মধ্যে একটি, যারা মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে জ্বালানির দাম বাড়ায়নি। ভারতে পেট্রোল ও ডিজেলের দাম এখনো চার বছর আগের পর্যায়েই রয়ে গেছে।
বরং মার্চে কয়েকটি রাজ্যে নির্বাচনের আগে ভারতের অর্থ মন্ত্রণালয় পেট্রোলের আবগারি শুল্ক লিটারে ১৩ রুপি থেকে কমিয়ে ৩ রুপি করেছে। একইভাবে ডিজেলের ওপর শুল্ক ১০ রুপি থেকে শূন্যে নামিয়ে আনা হয়েছে।
অনানুষ্ঠানিক হিসাবমতে, এই সিদ্ধান্তের ফলে বছরে প্রায় ১.৫৫ ট্রিলিয়ন রুপি রাজস্ব ক্ষতি হতে পারে ভারতের।
ভারতের তেলমন্ত্রী হরদীপ সিং পুরি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ লিখেছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে উচ্চমূল্যের কারণে তেল কোম্পানিগুলো প্রতি লিটার পেট্রোলে প্রায় ২৪ রুপি ও ডিজেলে ৩০ রুপি লোকসান দিচ্ছিল। এই লোকসান সামাল দিতে সরকার রাজস্ব আয়ে বড় ধরনের ছাড় দিয়েছে বলে তিনি জানান।
পুরি বলেন, বর্তমান দরে এই শুল্ক কমানোর ফলে তেল বিপণন কোম্পানিগুলোর বার্ষিক লোকসান ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে আসবে।
অন্যদিকে রপ্তানি সীমিত করতে ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানসহ রপ্তানিকারক কোম্পানিগুলোকে সহায়তা দিতে ভারতের অর্থ মন্ত্রণালয় এ মাসের শুরুর দিকে ডিজেল রপ্তানি শুল্ক প্রতি লিটারে ২১.৫ রুপি থেকে বাড়িয়ে ৫৫.৫ রুপি করেছে।
ভারত বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম জ্বালানি তেল আমদানিকারক হলেও বাংলাদেশসহ বেশ কিছু দেশে পরিশোধিত তেল রফতানি করে। রপ্তানিতে কর বৃদ্ধির এই সিদ্ধান্ত পাইপলাইনের মাধ্যমে ভারত থেকে বাংলাদেশের ডিজেল আমদানির ওপর প্রভাব ফেলবে।
বাংলাদেশের অনেক আগেই অভ্যন্তরীণ বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছিল পাকিস্তান, কিন্তু তারা ডিজেলের ওপর পেট্রোলিয়াম শুল্ক কমিয়ে শূন্যে নামিয়ে আনে। এই শুল্ক হ্রাসের ফলে দেশটিতে পেট্রোলের দাম লিটারপ্রতি ৮০ রুপি কমে যায়।
জ্বালানির মূল্য সমন্বয়ের পাশাপাশি তেলের ৫৫ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব থেকে জনগণকে সুরক্ষা দিতে পাকিস্তান বড় শহরগুলোতে বিনামূল্যে বাস সার্ভিস চালু করেছে এবং মোটরসাইকেল আরোহী, কৃষক ও পরিবহন অপারেটরদের জন্য সুনির্দিষ্ট ভর্তুকি দিচ্ছে।
সিন্ধু প্রদেশের নিবন্ধিত মোটরসাইকেল আরোহীরা মাসে ২ হাজার রুপি করে পাবেন—যা ২০ লিটার জ্বালানির ওপর প্রতি লিটারে ১০০ রুপি ভর্তুকির সমান।
কৃষকরা ডিজেল খরচ মেটাতে প্রতি একর জমির জন্য ১ হাজার ৫০০ রুপি পাবেন। অন্যদিকে বাস ও ট্রাকের ভাড়া বাড়াতে পারবে—এই শর্তে ভারী পরিবহন অপারেটররা নির্দিষ্ট পরিমাণ ভর্তুকি পাবে।
জ্বালানির বর্ধিত খরচ যাত্রী ও সাধারণ মানুষের ওপর না চাপানোর জন্য পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের নিবন্ধিত বাস ও ট্রাক মালিকরা ১ লাখ রুপি পর্যন্ত ভর্তুকি পাবেন।
