নাসিরুদ্দিন হোজ্জা গাধার পিঠে কেন উল্টো দিকে মুখ করে বসে আছেন?

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) আয়োজনে রাজধানীর আগারগাঁওয়ের পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠে আজ সোমবার পবিত্র ঈদুল ফিতরের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। জামাতের পর সবাইকে নিয়ে বের হয় এক আনন্দমিছিল।
সেই মিছিলের সামনের দিকে দুই সারিতে ছিল আটটি সুসজ্জিত ঘোড়া। আরও ছিল ১৫টি ঘোড়ার গাড়ি, মোগল ও সুলতানি আমলের ইতিহাস–সংবলিত ১০টি পাপেট শো।
এসব পাপেটের মধ্যে একটি পাপেটে দেখা যায়, এক ব্যক্তি গাধার পিঠে উল্টো দিক হয়ে বসে আছেন। তুরস্কের নাসিরুদ্দিন হোজ্জার ভাস্কর্যের আদলে এটি তৈরি করা হয়েছে।
তবে পাপেটটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই সমালোচনা করেছেন। ব্যবহারকারীরা বলছেন, পাপেটটি নাসিরুদ্দিন হোজ্জার আদলে তৈরি করলেও সেটিতে বিকৃতি ঘটেছে।

জাহিদুল ইসলাম নামে এক ব্যবহারকারী নাসিরুদ্দিন হোজ্জার ভাস্কর্যের ছবির সঙ্গে পাপেটটির ছবি পোস্ট করে তাতে লিখেছেন, 'নাসিরুদ্দিন হোজ্জার পাপেট বানাতে গিয়ে এটা কি বানিয়েছে কলা বিজ্ঞানীরা? এদের হাতে যে অনুষ্ঠানেরই দায়িত্ব দেওয়া হোক না কেন সেটাকে বিতর্কিত করতে কোনো না কোনো উপাদান রাখবেই। ঈদ আনন্দ মিছিলে এগুলোর আদৌও প্রয়োজন আছে কি?'
তিনি লিখেছেন, 'ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের এত প্রাণবন্ত একটি আয়োজনে এই কলা বিজ্ঞানীদের জন্য শেষ পর্যন্ত সমালোচনার হাত থেকে রক্ষা পাওয়া গেল না। পরবর্তী যেকোনো আয়োজনে এদের বিষয়ে আয়োজকরা সচেতন থাকবেন সেটাই প্রত্যাশা।'
পোস্টে খালিদ সাইফুল্লাহ নামে একজন কমেন্ট করেছেন, 'যারা বানিয়েছে তারা উদ্দেশ্যমূলকভাবে এ বিকৃতি ঘটিয়েছে। তাদের শাস্তির আওতায় আনা উচিত।'
মাকামে মাহমুদ নামে একজন তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক পোস্টে লিখেছেন, 'মূল কনসেপ্ট নাসিরুদ্দিন হোজ্জা, কিন্তু চেহারার আদল নিয়ে করেছে রাজনীতি! এবার বলেন, ঈদ মিছিলের এই ছবিটাকে কীভাবে দেখেন?'
মোজাম্মেল হোসেন তোহা তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে লিখেছেন, '১৫ বছরের ফ্যাসিবাদের পতনের পর মানুষের প্রথম ঈদ, প্রথম ঈদ মিছিল, এবার তাই আনন্দটাই দেখতে চাই। এগুলো নিয়ে এবার বিতর্ক, সমালোচনা না হোক।'
তিনি আরও লিখেছেন, 'ঈদ প্রধানত মুসলমানদের ধর্মীয় উৎসব। এখানে ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক উপাদান যত কম রাখা যায়, ততই ভালো। আগামী বছর থেকে ঈদ মিছিলে চাঁদ-তারা-মসজিদের প্রতিকৃতি রাখেন, প্রয়োজনে কাউকে নাসিরুদ্দিন সাজিয়ে সত্যিকার গাধার উপর চড়িয়ে হাজির করেন, একান্তই চাইলে কাঠের/হার্ডবোর্ডের শেপে টুডি প্রতিকৃতি আনেন; কিন্তু এরকম থ্রিডি মূর্তি যত এড়াতে পারেন, ততই ভালো।'
তুরস্কের নাসিরুদ্দিন হোজ্জা এবং তার গাধার পিঠে উল্টো দিক হয়ে বসার কারণ

নাসিরুদ্দিন হোজ্জার নাম শোনেননি এমন মানুষ হয়ত বিরল। তবে মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য এশিয়া এবং ইউরোপের কিছু অংশে তিনি একজন বিখ্যাত লোকচরিত্র। হাঙ্গেরি থেকে ভারত, চীন এবং দক্ষিণ সাইবেরিয়া থেকে উত্তর আফ্রিকা পর্যন্ত বিস্তৃত বিশাল ভৌগোলিক অঞ্চলজুড়ে তার গল্প প্রচলিত। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে লাখ লাখ শিশু নাসিরুদ্দিন হোজ্জার বুদ্ধির গল্প ও কৌতুক শুনে বড় হয়েছে।
অ্যামিউজিং প্ল্যানেট-এর এক প্রতিবেদনে নাসিরুদ্দিন হোজ্জা সম্পর্কে বলা হয়েছে, তিনি ছিলেন একইসাথে একজন জ্ঞানী ও সরল মানুষ। নিজের বুদ্ধি, প্রজ্ঞা ও সাধারণ জ্ঞান দিয়ে যেকোনো নাজুক পরিস্থিতি খুব সহজেই সামাল দেওয়ায় তার বেশ নাম ছিল। তার উপস্থিত বুদ্ধি ও বিজ্ঞতার খ্যাতি ছড়িয়ে গেছে দেশ-দেশান্তরে।
ধারণা করা হয়, নাসিরুদ্দিন হোজ্জার জন্ম বর্তমান তুরস্কের সিবরিহিসারের হোর্তু গ্রামে, ১২০৮ সালে। পরে তিনি এসকিসেহির এবং সেখান থেকে পরে কোনিয়ায় চলে যান। সেখানেই ১২৮৪ সালে তিনি মারা যান।
তবে কেউ কেউ বলেন, নাসিরুদ্দিন হোজ্জা নামে আসলে বাস্তবে কেউ ছিলেন না। এটি কেবল ১৩শ শতকে আনাতোলিয়ার আদিবাসীদের দ্বারা সৃষ্ট একটি কাল্পনিক চরিত্র।
তুরস্ক ও ইউরোপের বিভিন্ন স্থানে নাসিরুদ্দিন হোজ্জার বেশ কয়েকটি ভাস্কর্য রয়েছে। এগুলোর বেশিরভাগেই দেখা যায়, নাসিরুদ্দিন হোজ্জা গাধার পিঠে উল্টো দিক হয়ে বসে আছেন।
গাধার পিঠে তার এভাবে বসা নিয়েও একাধিক গল্প প্রচলিত আছে। আর তা হলো- একদিন নাসিরুদ্দিন হোজ্জা তার গাধার পিঠে উল্টো দিক হয়ে বসেছিলেন। লোকেরা যখন তাকে এর কারণ জিজ্ঞাসা করলেন, তখন তিনি উত্তরে বলেছিলেন, 'আমি গাধার পিঠে উল্টো দিক হয়ে বসিনি, বরং গাধাটিই ভুল দিকে মুখ করে আছে।'
নাসিরুদ্দিন হোজ্জার বেশিরভাগ গল্পেই তার গাধাটির উপস্থিতি পাওয়া যায়। কিছু গল্পে হোজ্জার উপস্থিত বুদ্ধির প্রকাশ ঘটেছে। আবার কিছু গল্পে তাকে পাওয়া যায় নিতান্তই বোকা ও সাদাসিধে মানুষ হিসেবে। তবে ঘটনা যাই হোক, তার গল্পগুলো শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষের আনন্দ জুগিয়ে আসছে।
একবার একদল ছাত্র নাসিরুদ্দিনের কাছে কিছু শিখতে চেয়েছিল। তিনি তৎক্ষণাৎ তার গাধাটির পিঠে চড়েন। তবে তিনি গাধার পিঠে বসেছিলেন উল্টো দিকে মুখ করে। আর ছাত্ররা তার পেছন পেছন চলছিল।
নাসিরুদ্দিনকে এভাবে গাধার পিঠে বসতে দেখে ছাত্ররা বেশ অবাকই হলো। তারা ভাবতে লাগল, যে ব্যক্তি নাসিরুদ্দিনকে জ্ঞানী বলেছিলেন, তিনি সম্ভবত ভুল বলেছিলেন। এক ছাত্র তখন ফিসফিস করে বলেছিল, 'একমাত্র বোকাই এভাবে গাধার পিঠে বসতে পারে।'
আরেকজন উচ্চস্বরে বললেন, 'হোজ্জা, কেন আপনি গাধার পিঠে উল্টো হয়ে বসেছেন? এটা তো কোনো মানে হয় না।'
হোজ্জা তখন জবাবে বলেছিলেন, 'ঠিক আছে, যদি আমি সাধারণভাবে সামনে মুখ করে বসি, আর তুমি আমার পেছন পেছন হাঁটতে, তাহলে আমরা কথা বলতে পারতাম না, তাই না? আর যদি তুমি আমার সামনে সামনে হাঁটতে, সেক্ষেত্রে তোমার পিঠ আমার দিকে থাকত, তখনও আমরা কথা বলতে পারতাম না। কিন্তু এখন যেভাবে বসে আছি, আমরা একে অপরকে সামনাসামনি দেখতে পাচ্ছি। এটা অনেক ভালো উপায় কথা বলার। তুমি কি একমত নও?'
হোজ্জার জবাবের শেষে ছাত্ররা দ্বিধায় পড়ে গেল। কারণ কয়েক মুহূর্ত আগেও তারা ভাবত কেবল একজন বোকাই গাধার পিঠে উল্টো দিকে মুখ করে বসতে পারে। কিন্তু এখন তারা দ্বিধাগ্রস্ত যে গাধার পিঠে উল্টো করে বসা ব্যক্তি আসলেই কি বোকা হতে পারেন, নাকি বোকা নন।