৫ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অবসায়ন চূড়ান্ত, ৪টিকে ঘুরে দাঁড়াতে ৩ মাসের সময় দিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক
নানা অনিয়মের কারণে সংকটে থাকা পাঁচটি নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা এনবিএফআই অবসায়নের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সঙ্গে আরও চারটি প্রতিষ্ঠানকে শর্তসাপেক্ষে তিন মাস সময় দেওয়া হয়েছে।
'ব্যাংক রেজল্যুশন আইন, ২০২৬'-এর আওতায় সংকটাপন্ন নয়টি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক বোর্ড সভায় আর্থিক সক্ষমতা প্রতিবেদন বা ফিন্যান্সিয়াল ভায়াবিলিটি রিপোর্ট পর্যালোচনার পর এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
অবসায়ন হতে যাওয়া পাঁচ আর্থিক প্রতিষ্ঠান হলো—পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড, ইন্টারন্যাশনাল লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড, আভিভা ফাইন্যান্স কোম্পানি লিমিটেড, এফএএস ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড এবং ফারইস্ট ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, এই পাঁচ প্রতিষ্ঠানের আমানতকারীদের পাওনা পরিশোধকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এ জন্য সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে বিশেষ তহবিল বরাদ্দের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
তবে আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরুর আগে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলকভাবে ফরেনসিক অডিট পরিচালনা করা হবে। দেশের স্বনামধন্য অডিট ফার্মের মাধ্যমে পরিচালিত এ তদন্তে আর্থিক অনিয়মের জন্য যারা দায়ী বলে চিহ্নিত হবেন, তাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, অবসায়ন বা বন্ধের তালিকায় থাকা পাঁচ আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ২৭ হাজার আমানতকারীর প্রায় ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা জমা রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রশাসক নিয়োগের পর শুরুতে ব্যক্তি আমানতকারীরা ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত পাবেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর শেষে এফএএস ফাইন্যান্সের খেলাপি ঋণের হার দাঁড়িয়েছে ৯৯.৯৯ শতাংশ, ফারইস্ট ফাইন্যান্সের ৯৮.৫০ শতাংশ, আভিভা ফাইন্যান্সের ৯৩.৯৩ শতাংশ, পিপলস লিজিংয়ের প্রায় ৯৫ শতাংশ এবং ইন্টারন্যাশনাল লিজিংয়ের ৯৯.৪৪ শতাংশ। অর্থাৎ এসব প্রতিষ্ঠানের প্রায় শতভাগ ঋণই খেলাপি।
প্রতিষ্ঠান পাঁচটির মধ্যে আভিভা ফাইন্যান্সের চেয়ারম্যান ছিলেন চট্টগ্রামের বিতর্কিত ব্যবসায়ী সাইফুল আলম, যিনি এস আলম নামে পরিচিত। অন্য চারটির নিয়ন্ত্রণ ছিল আর্থিক প্রতিষ্ঠান কেলেঙ্কারির দায়ে বহুল আলোচিত ব্যক্তি প্রশান্ত কুমার হালদার বা পি কে হালদারের হাতে। তাদের সময়ে এসব প্রতিষ্ঠান থেকে নামে-বেনামে অর্থ তুলে নেওয়া হয়। ফলে দীর্ঘদিন ধরে আমানতকারীরা টাকা ফেরত পাচ্ছেন না।
অন্যদিকে তুলনামূলকভাবে কম সংকটাপন্ন চারটি প্রতিষ্ঠানকে শর্তসাপেক্ষে তিন মাস সময় দেওয়া হয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—প্রাইম ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট লিমিটেড, জিএসপি ফাইন্যান্স কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেড, বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স কোম্পানি লিমিটেড বা বিআইএফসি এবং প্রিমিয়ার লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স লিমিটেড।
রেজল্যুশন আইনের ১৫ ধারা অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানকে অকার্যকর অবস্থা থেকে পুনরায় কার্যকর বা ভায়াবল অবস্থায় ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে এ সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তবে এ জন্য তাদের পর্ষদকে বেশ কিছু কঠোর শর্ত পালন করতে হবে।
এর মধ্যে রয়েছে স্পনসর শেয়ারহোল্ডারদের মাধ্যমে নতুন মূলধন জোগান, নিজস্ব সম্পদ ও সম্পত্তি বিক্রি এবং খেলাপি ঋণ আদায়ের মাধ্যমে তারল্য সংকট কাটানো।
বাংলাদেশ ব্যাংক চিঠিতে জানিয়েছে, নির্ধারিত তিন মাসের মধ্যে কোনো একটি শর্ত পূরণেও কোম্পানিগুলো ব্যর্থ হলে তাদের বিরুদ্ধেও অবিলম্বে রেজল্যুশন বা অবসায়ন প্রক্রিয়া শুরু করা হবে।
শর্তপ্রাপ্ত চার প্রতিষ্ঠানকে প্রতি মাসের ৭ তারিখের মধ্যে অগ্রগতির মাসিক প্রতিবেদন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রেজল্যুশন বিভাগে জমা দিতে হবে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ সময়োপযোগী ও সাহসী পদক্ষেপের ফলে আমানতকারীদের মধ্যে হারানো আস্থা পুনরুদ্ধার হবে।
উচ্চ খেলাপি ঋণ এবং আমানত ফেরত দিতে ব্যর্থ হওয়ায় কেন ২০টি এনবিএফআই বন্ধ করা হবে না, তা জানতে চেয়ে গত বছরের মে মাসে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নোটিশ দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে নয়টি প্রতিষ্ঠানের পুনরুদ্ধার বা ঘুরে দাঁড়ানোর কর্মপরিকল্পনা সন্তোষজনক না হওয়ায় সেগুলো বন্ধ বা অবসায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
