ব্যাংকের বোর্ডে ৫০ শতাংশ স্বতন্ত্র পরিচালক নৈতিকভাবে সমর্থন করি না: মাসরুর আরেফিন
ব্যাংক কোম্পানি আইনে একটি ব্যাংকের ৫০ শতাংশ স্বতন্ত্র পরিচালক রাখার যে খসড়া করা হয়েছে—তা নৈতিকভাবে সমর্থন করেন না ব্যাংকারদের শীর্ষ সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মাসরুর আরেফিন।
শনিবার (১১ এপ্রিল) গুলশানে 'রিস্ক কনফারেন্স অন ব্যাংকিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স ২০২৬'- শীর্ষক সম্মেলনে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এ কথা বলেন।
মাসরুর আরেফিন বলেন, "আহসান এইচ মনসুর স্যার চেয়েছিলেন ব্যাংক বোর্ডে ৫০ শতাংশ স্বতন্ত্র পরিচালক হোক। এবিবির চেয়ারম্যান হয়ে এটা হতে আমি বাঁধা দিচ্ছি। কারণ এটা নৈতিকভাবে আমি সমর্থন করি না। কারণ ওনারা (স্বতন্ত্র পরিচালক) ব্যাংকে এসে ভরে যাবে। ১৫ জনের মধ্যে ৭ জন স্বতন্ত্র পরিচালক হলে দুই গ্রুপের মধ্যে একটা ঝামেলা তৈরি হবে, আর মাঝখানে পড়বে এমডি।"
তিনি বলেন, "আমি মনে করি না, একই বাঙালি একই শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে তারা স্বতন্ত্র পরিচালক হয়ে ফেরেশতা হয়ে যাবে, আর স্পন্সর পরিচালকরা সব শয়তান, এটা অসম্ভব। এক্ষেত্রে বিদেশী ব্যাংকগুলোকে অনুসরণ করা উচিত। একজন দেখবে ব্যাংকের প্রবৃদ্ধি, তিনি ব্যাংকের ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে কাজ করেন, কীভাবে সেই ব্যাংকে আরো প্রবৃদ্ধি বাড়ানো যায়। আরেকজন স্বতন্ত্র পরিচালক কাজ করেন সেই ব্যাংকের গভর্নেন্স ও সুশাসন নিয়ে কাজ করবেন এবং আরেকজন কাজ করবেন ক্রেডিট রিস্ক নিয়ে। এটাই কিন্তু বিদেশি ব্যাংকে অনুসরণ করা হয়। হার্ভাড লেভেলের পড়ালেখা ও অভিজ্ঞতা সম্পন্নরা সেই চেয়ারে বসেন। আর তারা কিন্তু অনেক ভালোও স্যালারিও পান।"
"স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়ে আমাদের (এমডিদের) অভিজ্ঞতাও খুব একটা ভালো নয়, অনেক ক্ষেত্রে তারা বিভিন্ন জনের সিভি দিতেই ব্যস্ত থাকেন। এরা নিজেদের সুবিধা ও বোর্ডকে খুশি করার জন্যই ব্যস্ত থাকেন। আর এই যদি হয় বাস্তবতা, তাহলে ৫০ শতাংশ স্বতন্ত্র পরিচালক দিয়ে কোন কাজে আসবে না, বরং ব্যাংকখাতে একই সার্কাস চলতে থাকবে" –তিনি যোগ করেন।
ব্যাংকের প্রধান দুটি ঝুঁকি তারল্য ও ঋণ
মাসরুর আরেফিন বলেন, "ব্যাংকে এত এত ঝুঁকির কথা বললেও—ক্রেডিট রিস্ক ও লিকিউডিটি রিস্ক- এ দুটিই ব্যাংকখাতের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। তবে এখন হচ্ছে মার্কেট রিস্কও দেখা যাচ্ছে। ক্রেডিট রিস্কের কারণে ব্যাংক ডোবে, এই ক্রেডিট রিস্কের কারণেই ব্যাংকের বোর্ডে ডাকাতি হয়, এ ক্রেডিট রিস্কের কারণেই বোর্ডও ডোবে।"
তিনি বলেন, "কোন ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে বোর্ড নির্ধারণ করে দেয়, তখন ব্যাংকের আরো বেশি ঝুকি তৈরি করে, যদি সেটা খারাপ লোন হয়। ব্যাংকের এমডিকে চাপ দিয়ে বোর্ড ঋণের অর্থ ছাড় করিয়ে নেয়। ১০০ কোটি টাকা দেওয়া হবে, কি কারণে দেওয়া হবে কিংবা আদৌ কোনো কোলাটেরাল (জামানত) থাকবে কিনা—সেটা বিবেচনায় না নিয়েই এমডিকে চাপ দেওয়া হবে। এর মধ্যে বেনামি ঋণ ঢুকে বিষয়টি আরো মারাত্মক পর্যায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তাই অনেক সময় বোঝা যায় না যে, (ঋণের) আসল সুবিধাভোগী কে? ৩০০ টাকা থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত একটি ব্যাংকের বিভিন্ন জিনিসপত্র কেনা লাগে। এটার মধ্যেও অনেক সময় তারা ঢোকেন। এগুলো হচ্ছে খারাপ ব্যাংকের লক্ষণ। আইনের সহায়তা এজন্য অনেক দরকার।"
মাসরুর আরেফিন বলেন, "একটা ব্যাংকের কালচার কিন্তু অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটা জিনিস। ক্যামেলস রেটিংসে কালচারের কোন কথা নেই। কিন্তু ব্যাংকের কর্মকর্তারা বুঝবে যে, ব্যাংকের কালচার কোন দিকে যাচ্ছে। এমডি স্বৈরতন্ত্র পদ্ধতিতে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন কিনা।"
তিনি বলেন, "অতীতে আমরা বোকার স্বর্গে ছিলাম যে, দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৯ শতাংশ। এখন আমরা জানি দেশের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৪০ শতাংশ, এই সত্য জানার মধ্যেই বিজয়ের ৫০ শতাংশ হয়ে গেছে। আগে তো সত্যটাই জানতাম না।"
"ব্যাংকের এমডিরা প্রায়ই বোর্ডকে খুশি করাতে ব্যস্ত থাকে। তাদেরও কিন্তু এটা ব্যক্তিত্বেরও বিশাল ব্যাপার। খালি বোর্ড, বোর্ড করলে হবে না। কারণ ক্রেডিট রিস্ক কমিটি, ক্রেডিট কমিটি এবং আরো অন্য গুরুত্বপূর্ণ কমিটি রয়েছে। তাই এখানে কেবল বোর্ড থেকে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিলেই হবে না। কারণ ব্যাংক জনগণের টাকা নিয়ে ব্যবসা করছে, জনগণের প্রতি তার একটা দায়বধ্যতা রয়েছে" –তিনি যোগ করেন।
