চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে সরকারের পরিচালন ব্যয়ের ৩৫.৩৩ শতাংশই গেছে সুদ পরিশোধে
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে সরকারের পরিচালন ব্যয়ের ৩৫.৩৩ শতাংশ বা ৩১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে ঋণের সুদ পরিশোধে। একক খাত হিসেবে এটিই সবচেয়ে বেশি ব্যয়। অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক—উভয় ঋণের সুদ পরিশোধে এই অর্থ ব্যয় হয়েছে।
যদিও পরিচালন বাজেটেও সর্বোচ্চ বরাদ্দ রাখা হয়েছে সুদ পরিশোধ খাতে।
চলতি অর্থবছরে সরকার মোট ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের বাজেট নিয়েছে। এর মধ্যে পরিচালন বাজেটে বরাদ্দ ৫ লাখ ৪৪ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা। এই পরিচালন বাজেটের ২২ শতাংশ বা ১ লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা রাখা হয়েছে সুদ পরিশোধের জন্য। এর মধ্যে অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ বাবদ এক লাখ কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণের সুদ বাবদ ২২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসের (জুলাই-সেপ্টেম্বর) গভর্নমেন্ট ফাইন্যান্স স্ট্যাটিস্টিকস প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরেছে হিসাব মহানিয়ন্ত্রকের কার্যালয়। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম তিন মাসে সরকার মোট ৯০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করেছে। এর মধ্যে সরকারি কর্মচারীদের বেতন, ভাতা ও পেনশন বাবদ ব্যয় হয়েছে ১৬ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। পণ্য ও সেবা বাবদ ব্যয় ৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকা, ভর্তুকিতে ১৫ হাজার ৮০০ কোটি টাকা, অনুদানে ৮ হাজার ৪০০ কোটি টাকা এবং সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ব্যয় হয়েছে ৮ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। অন্যান্য খাতে ব্যয় হয়েছে ৩ হাজার ১০০ কোটি টাকা। পাশাপাশি নন-ফাইন্যান্সিয়াল সম্পদ অধিগ্রহণে ব্যয় করা হয়েছে ১২ হাজার ৬০০ কোটি টাকা।
এদিকে, পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে উন্নয়ন ব্যয় হয়েছে ১২ হাজার ১৫৮ কোটি টাকা।
এই সময়ে সরকারের মোট আয় ছিল ১ লাখ ১৭ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও অন্যান্য কর থেকে আয় হয়েছে ৯২ হাজার ১০০ কোটি টাকা। অনুদান হিসেবে পাওয়া গেছে ৭০০ কোটি টাকা। কর-বহির্ভূত রাজস্ব ও অন্যান্য আয় হয়েছে ২৫ হাজার কোটি টাকা।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে পরিচালন ব্যয় করতে সরকারকে কোনো ঋণ নিতে হয়নি। মোট রাজস্ব আয় থেকে পরিচালন ব্যয় ও নন-ফাইন্যান্সিয়াল সম্পদ অধিগ্রহণ ব্যয় করার পর সরকারের হাতে উদ্বৃত্ত ছিল ১৫ হাজার ২০০ কোটি টাকা। সেখান থেকে উন্নয়ন ব্যয় করার পরও সরকারি হিসাবে ৩ হাজার ৪২ কোটি টাকা উদ্বৃত্ত থাকে।
অর্থ বিভাগের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, উন্নয়ন ব্যয় কম হওয়ায় সরকারি হিসাবে উদ্বৃত্ত দেখা গেছে। বর্তমান সরকারের সময়ে প্রকল্প কম নেওয়া হয়েছে এবং চলমান প্রকল্পগুলোতেও ব্যয় তুলনামূলকভাবে কম হয়েছে।
তিনি বলেন, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের রাজস্ব সংগ্রহ ২০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। তবে সে অনুযায়ী উন্নয়ন ব্যয় হয়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে একটি বেসরকারি গবেষণা সংস্থার অ্যাডিশনাল ডাইরেক্টর (রিসার্চ) তৌফিকুল ইসলাম খান টিবিএসকে বলেন, বাজেটে সুদ পরিষেবা ও বেতন-ভাতার বরাদ্দ সবসময় নির্দিষ্ট থাকে এবং আগের নেওয়া ঋণের সুদ পরিশোধ করতেই হয়। ফলে এই ব্যয় কমানোর সুযোগ নেই। "অর্থবছরের শুরুতে অন্যান্য খাতে যে ব্যয় হওয়ার কথা ছিল, তা না হওয়ায় মোট ব্যয়ের বড় অংশ সুদ পরিশোধে যাচ্ছে বলে পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে। খুব কম সময়ে এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব নয়।"
তিনি আরও বলেন, "সরকার যদি রাজস্ব সংগ্রহ বাড়াতে পারে এবং উচ্চ সুদের ঋণ এড়িয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে, তাহলে ঋণের সুদ পরিশোধের চাপ কমবে। কিন্তু সাম্প্রতিক কয়েক অর্থবছরে দেখা গেছে, পরিচালন ব্যয় মেটাতেও ঋণ নিতে হয়েছে। ঋণ নেওয়া হলে তা এমন খাতে ব্যয় করা উচিত, যাতে ওই ব্যয় থেকে সৃষ্ট সম্পদের পরিমাণ ঋণ ও সুদের চেয়ে বেশি হয়।"
তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, একসময় ঘাটতি বাজেট নিয়ে খুব বেশি উদ্বেগ ছিল না। কিন্তু সেই কাঠামো ভেঙে গেছে। এর ফলে বাংলাদেশ ঋণের ঝুঁকিতে পড়েছে এবং বাজেট কাঠামোও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। নির্বাচিত সরকারকে অবশ্যই বিষয়টি গভীরভাবে পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
