আগামী সপ্তাহেই সম্মিলিত ব্যাংক চালু হবে: গভর্নর
আগামী সপ্তাহ থেকে সমস্যাগ্রস্ত পাঁচ শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক একীভূত হয়ে গঠিত হওয়া সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক চালু হতে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর।
শনিবার (২৯ নভেম্বর) রাজধানীর একটি হোটেলে 'চতুর্থ বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সম্মেলন ২০২৫' অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।
গভর্নর বলেন, ব্যাংক রেজ্যোলুশন অর্ডিন্যান্স পাঁচটি ব্যাংকে প্রয়োগ করা হচ্ছে। এতে একীভূত করে একটি নতুন ব্যাংক গঠন হবে। 'আমরা আশাবাদী আগামী সপ্তাহেই লঞ্চিং হয়ে যাবে। এতে ৩৫ হাজার কোটি টাকার পেইড-আপ ক্যাপিটাল থাকবে। আমরা পাঁচ দুর্বল ব্যাংক নিয়ে একটি সবল ব্যাংক গঠন করতে যাচ্ছি। এতে সরকার ২০ হাজার কোটি টাকা দিচ্ছে,' বলেন তিনি।
এছাড়া ব্যাংকিং খাতে বর্তমানে খেলাপি ঋণের যে চিত্র, সেখান থেকে উত্তরণের জন্য ৫ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত সময় লাগবে বলেও উল্লেখ করেন গভর্নর।
তিনি বলেন, 'খেলাপি ঋণ ব্যাংকিং খাতে অনেক বড় একটা সমস্যা। বর্তমানে ৩৫ সশতাংশ খেলাপি ঋণ। এটা কোনো ছোটখাটো সমস্যা নয়। এক-তৃতীয়াংশের বেশি খেলাপি ঋণ হয়েছে। এটা ধরে নিয়েই আমাকে ব্যাংক খাত চালাতে হবে। আর এ চিত্র থেকে উত্তরণের জন্য পাঁচ থেকে দশ বছর পর্যন্ত সময় লেগে যাবে।'
দুর্বল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে (এনবিএফআই) আইন মোতাবেক যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলেন গভর্নর। ৯টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ করা হবে এবং এ বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে সব রকমের সাহায্য পাওয়া যাবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
আহসান এইচ মনসুর বলেন, 'কোন কোন ব্যাংক ও এনবিএফআই খারাপের দিকে যাচ্ছে, তাদের সতর্ক করা হবে এবং পরবর্তীতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা হবে না, বিশেষ কারণেও হবে না। যখন দরকার হবে, তখন করা হবে। এটার জন্য আইন করা হয়েছে, আলাদা বিভাগ করা হয়েছে। তাছাড়া ৯টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান অবসায়ন করতে যাচ্ছি। এতে সরকার পুরোপুরিভাবে কমিটেড।'
গভর্নর আরও বলেন, 'আগামী দিনে নির্বাচনের মাধ্যমে যে সরকার আসবে, তারা এটা অনুধাবন করবে। যেহেতু আর্থিক খাতে অনেক ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে, সেটা মোকাবিলা করার জন্য যে প্রক্রিয়াগত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে সেটাকেও তারা বিশ্লেষণ করে সমর্থন করবে এবং এ প্রক্রিয়াকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবে।'
তিনি বলেন, 'বর্তমানে ব্যাংকগুলোতে পর্যাপ্ত পরিমাণে ডলার রয়েছে। আমি আগেও বলেছিলাম মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে হলে ডলার মার্কেটকে স্থিতিশীল করতে হবে। বর্তমানে ডলার মার্কেট স্থিতিশীল রয়েছে, বরং প্রয়োজনের চেয়ে বেশি স্ট্যাবল রয়েছে। কারণ আমি গভর্নর হিসাবে যখন যোগদান করি তখন ডলারের দর ছিল ১২০ টাকা, আর এখন ১২২ টাকা ৫০ পয়সা। কোনো রকমের ইন্টারভেনশন হচ্ছেও না, আর পুরোপুরি মার্কেট-বেজড অপারেশন হচ্ছে। তাই আমরা যত ইচ্ছা আমদানি করতে পারব। কেউ যদি বলেন আমদানি করতে পারছেন না, তাহলে এটা ওনার সমস্যা। ব্যাংকে ডলারের কোনো অভাব নেই। আপনারা (ব্যবসায়ী) টাকা নিয়ে আসতে পারলে যেকোনো অ্যামাউন্টের এলসি খুলতে পারবেন। আর টাকা নিয়ে আসার দায়িত্ব আপনাদের। কেন্দ্রীয় ব্যাংক সকল রকমের মার্জিন তুলে দিয়েছে।'
গভর্নর আরও বলেন, 'আগের রমজানে পণ্য আনার ক্ষেত্রে এক রকম চ্যালেঞ্জ ছিল। পর্যাপ্ত ডলার দিয়েই সরবরাহ ঠিক করা হয়েছিল। তবে আসন্ন রমজানে কোনো ধরণের শঙ্কা দেখছি না। কারণ রমজানে যেসব ভোগ্যপণ্য লাগে, তার প্রত্যেকটির এলসি খোলা আগেই হয়ে গেছে। পরিসংখ্যান দিয়ে বললে হবে না যে আমদানি কম। কারণ আমদানির বিপরীতে পাচার বন্ধ হয়েছে।'
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আসন্ন রমজানকে সামনে রেখে মৌসুমি চাহিদা মেটাতে দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী ও আমদানিকারকরা ছয়টি নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে।
রমজানে সয়াবিন তেল, চিনি, মসুর ডাল, ছোলা, মটর ডাল ও খেজুরের চাহিদা বেড়ে যায়। এ কারণে চলতি বছরের সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে এসব পণ্যের জন্য ঋণপত্র (এলসি) খোলা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায়।
তথ্য বলছে, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এ সময়ে সয়াবিন তেল আমদানি বেড়েছে ৩৬ শতাংশ, চিনি ১১ শতাংশ, মসুর ডাল ৮৭ শতাংশ, ছোলা ২৬ শতাংশ, মটর ডাল ২৯৪ শতাংশ এবং খেজুরের আমদানি বেড়েছে ২৩১ শতাংশ।
গভর্নর বলেন, নীতিসুদ হারের সাথে মূল্যস্ফীতির গ্যাপ হওয়া উচিত আড়াই থেকে তিন শতাংশ পর্যন্ত। বর্তমানে ৮.২০ শতাংশ মূল্যস্ফীতি। এটা এর চেয়ে কম কিংবা ৭ এর ঘরে নিয়ে আসলে নীতিসুদহার কমানো হবে।
সিটি ব্যাংকের এমডি মাশরুর আরেফিন বলেন, "এখন সামগ্রিকভাবে ক্রেডিট গ্রোথ ধীরগতির। ব্যবসায়ীরা সময় নিচ্ছেন, কারণ তারা বুঝতে চান অর্থনীতি কোন দিকে যাচ্ছে। মূল্যস্ফীতি ছিল ১২ শতাংশের কাছাকাছি, এখন ৮.১৭ শতাংশ। যদিও কেন্দ্রীয় ব্যাংক এটিকে ৫ শতাংশে নামাতে চায়। নির্বাচনের পর বিনিয়োগ পরিস্থিতির উন্নতি হবে।"
তিনি আরও বলেন, "ডলার মার্কেটে কোনো হস্তক্ষেপ হচ্ছে না—এটা বহুদিনের স্বপ্ন ছিল। দেশে বছরে ৫০ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আয়, ৩০ বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স। মাসে ৫ বিলিয়ন ডলারের মতো আমদানি ব্যয় হলে বছরে হয় ৭০ বিলিয়ন। অর্থাৎ আয় হচ্ছে ৮০ বিলিয়ন, ব্যয় ৭০ বিলিয়ন—এটাকে ইতিবাচক বলা যায় এবং বাজারে শৃঙ্খলাও আসছে।"
তিনি জানান, প্রতিদিন আন্তঃব্যাংক লেনদেনের পরিমাণ প্রায় ৫০ মিলিয়ন ডলার। আগে কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ঘাটতি ছিল ১৯ বিলিয়ন ডলার, এখন তা ৪০০ মিলিয়ন। ফাইন্যান্সিয়াল অ্যাকাউন্টেও কয়েক বিলিয়ন ডলার উদ্বৃত্ত রয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, পরিস্থিতি আরও ভালো হবে।
আরেফিন বলেন, "রিজার্ভ মানি কমে ৩ লাখ কোটির মতো দাঁড়িয়েছে। আগের সরকার নিজেদের নামে ট্রেজারি বিল-বন্ড ডিভলভ করত, যা এখন আর হচ্ছে না। এ কারণে রিজার্ভ মানি কমেছে। আমানতের প্রবৃদ্ধি কিছুটা কম হলেও প্রায় ১০ শতাংশ।"
তিনি জানান, ব্যাংকিং খাতে সামগ্রিক ক্রেডিট গ্রোথ কম হলেও টপ টিয়ার ব্যাংকগুলো—এর মধ্যে সিটি ব্যাংকও—ভালো প্রবৃদ্ধি পাচ্ছে।
বিআইডিএস মহাপরিচালক একে এনামুল হক বলেন, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা অনেকটাই 'চোর ধরার মনোভাব'-ভিত্তিক, যা ব্যবসায় আস্থার সংকট তৈরি করে। তার মতে, "যদি অর্থনীতি আস্থানির্ভর না হয়, তাহলে ব্যবসা-বিনিয়োগ কোনোটাই আত্মবিশ্বাস নিয়ে এগোতে পারে না। আস্থা ছাড়া অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন।"
তিনি বলেন, "দেশে অনেক নিয়ন্ত্রক সংস্থা আছে, কিন্তু তাদের কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মতো দায়বদ্ধতার কাঠামো নেই। দেশের করব্যবস্থা আজও জমিদারি ব্যবস্থার মতো—যেখানে কর আদায়ই মূল লক্ষ্য, দেশের উন্নয়ন নয়।"
