নজরুলের প্রতিকৃতি: বিস্মৃত এক আলোকচিত্রী
সুরের মূর্ছনায় বুদ হয়ে আছেন কাজী নজরুল ইসলাম। চোখ বন্ধ করে বাঁশিতে সুর তুলছেন কবি। সেই সুরে অফুরন্ত প্রাণশক্তির নির্ঝর। কবির মাথায় ঘন-কালো ঝাঁকড়া চুল। চোখে, নাকে আর থুতনি ভাজে আলোর ছায়া। গায়ে জড়ানো খদ্দরের মোটা চাদর। পেছনে ঘন গাছালি, তার পেছনে উন্মুক্ত আকাশ।
বিদ্রোহী কবির সবচেয়ে তারুণ্যদীপ্ত ছবি এটি। আজ থেকে ঠিক এক শ বছর আগে ১৯২৬ সালে কবির বাঁশি বাজানোর এই অনবদ্য ছবিটি তুলেছিলেন মুহম্মদ হবীবুল্লাহ বাহার চৌধুরী (১৯০৬-১৫ মে ১৯৬৬)।
ছবিটা কিন্তু তোলা হয়েছিল দশ টাকা দামের একটা সাধারণ মানের বক্স ক্যামেরায়। ছবিটা যখন তোলা হয়, তখন বাহার পড়তেন চট্টগ্রাম কলেজের বিএ ক্লাসে। স্কুলে পড়ার সময়ই তার ছবি তোলার বাতিক দেখা দেয়। পরবর্তী সময়ে তিনি পূর্ববাংলার শিক্ষা, সংস্কৃতি, ক্রীড়া, সাংবাদিকতা ও রাজনীতির এক উজ্জ্বল ব্যক্তিত্বে পরিণত হন। দেশভাগের পর ১৯৪৭ সালে হয়েছিলেন পূর্ব পাকিস্তান সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী। নজরুল তাকে সম্বোধন করতেন 'বাহার' বলে।
নজরুল চট্টগ্রাম সফরে আসেন অন্তত চারবার। এর মধ্যে দুবারই তিনি বাহারের বাড়িতে অবস্থান করেন। প্রথমবার আসেন ১৯২৬ সালের জুলাই মাসে বাহারের আমন্ত্রণে। চারদিকে তখন অসহযোগ আন্দোলনের ঢেউ। আর সমস্ত ভারতবর্ষে চলছে ইংরেজ বিতারণের চেষ্টা।
বিদ্রোহের ধ্বজা উড়িয়ে নজরুলের খ্যাতি তখন আকাশের চূড়ার দিকে।
সেই সময় অধ্যাপক হেমন্তকুমার সরকারকে (১৮৯৭-৩ নভেম্বর ১৯৫২) সঙ্গে নিয়ে তিনি চট্টগ্রামে আসেন। আস্তানা গাড়েন বাহারের মাতামহ খানবাহাদুর আবদুল আজীজের (১৮৬৩-১৯২৬) তামাকুমুন্ডির বাড়িতে। বাহার তখন চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্র সংসদের সম্পাদক।
বাহারদের বাড়িতে কবির একমুহূর্তও পান আর চা ছাড়া চলত না। কবি হাসির ঝরনা ফুটিয়ে বলতেন, 'থাকি আমি পানবাগানে, পান বা গানের দুয়ের এক আমার চাই-ই।' কবি তখন আসলে কলকাতার পানবাগান লেনে থাকতেন। তাই তার এমন রহস্য।
নজরুলের আগমনে তামাকুমুন্ডির আজীজ মঞ্জিলে প্রাণের হিল্লোল বইল। সেই হিল্লোল ছড়িয়ে পড়ল পাড়ায় থেকে মহল্লায়, শহরের সর্বত্র। বাহারের বন্ধু-সুহৃদ আবুল ফজল, অনন্তলাল সিং, গণেশ ঘোষ, পূর্ণেন্দু দস্তিদার, কবি দিদারুল আলম, রবিউল হোসেন, মনিরুজ্জামান, ইস্কান্দার, কানাই আর সুধীন্দ্রসহ অসংখ্য তরুণ ও ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের বিপ্লবীদের পদচারণায় গুলজার হয়ে উঠল আজীজ মঞ্জিল। কবিকে একনজর দেখার জন্য, একটুখানি গান শোনার জন্য, কবিতা শোনার জন্য বাঁধভাঙা স্রোতের মতো লোক এসে ভিড় জমাতে থাকে ছোট্ট কাঠের বাড়ির সেই আঙিনায়। কবি যখন বাইরে যেতেন, সেই ভিড় জোয়ারের মতো তার পিছু ছুটত। চট্টগ্রামের মাটিতে এ এক অভূতপূর্ব ঘটনা!
নজরুলের কথায়, গল্পে, কবিতায়, গানে, গজলে, বক্তৃতায় আর অবিরাম হাসিতে চট্টগ্রামের আকাশ-বাতাস আর মাটি-জল কেঁপে উঠল। ওই সময় (২৪ জুলাই ১৯২৬) চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্র সংসদের পক্ষ থেকে নজরুলকে আনুষ্ঠানিক সংবর্ধনা দেওয়া হয়। সেখানেও কবি গান আর কবিতায় আসর মাতিয়ে তুললেন।
চট্টগ্রাম এসে কবি ঘুরে বেড়ান কর্ণফুলী নদী, সীতাকুণ্ডের দুর্গম পাহাড়, পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত–আরও কত না জায়গায়। সেই সময় কবির অসংখ্য ছবি তোলেন বাহার। বাহারের তোলা কবির একটা বিখ্যাত ছবি আছে। নির্জন পাহাড়ের গায়ে আত্মমগ্ন নজরুল। পেছনে বিস্তৃর্ণ ঝরনা। ওপর থেকে এর জলের ধারা কবির পায়ের কাছ দিয়ে নিচে নেমে যাচ্ছে। ঝরনার শব্দে তিনি ধ্যানমগ্ন। অপূর্ব নৈসর্গিক আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি সীতাকুণ্ডের পাহাড়ে কবির এই মগ্নতার কয়েকটি ছবি ক্যামেরায় ধারণ করেন বাহার।
কবিকে তিনি চট্টগ্রাম থেকে ঘোড়ায় করে সীতাকুণ্ডে নিয়ে গিয়েছিলেন বলে জানা যায়। একবার পাহাড়ে উঠে জোঁকের ভয়ে কবি নাকি আর নিচে নামতে চান না। এত বড় বিদ্রোহী, যার ভয়ে কাঁপে ইংরেজ সাহেবরা, তিনি সামান্য জোঁকের ভয়ে কাতর। পরে বাহার ও তার বন্ধুরা মিলে কবিকে কাঁধে করে নিচে নিয়ে আসেন। সীতাকুণ্ডের বিখ্যাত চন্দ্রনাথ পাহাড়ে উঠেছিলেন তিনি। এই পাহাড়ের চূড়ায়ই চন্দ্রনাথ মন্দির।
প্রায় এগারো শ ফুট উঁচু এই পাহাড়ের কতটুকু উচ্চতায় উঠেছিলেন নজরুল, সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায় না। তবে কেউ কেউ বলেন, নজরুল এই পাহাড়ের চূড়ায় উঠেছিলেন। চন্দ্রনাথ এমন একটি পাহাড়, যার ওপর উঠে দাঁড়ালে দখিনে কেবলই হাতছানি দেয় বঙ্গোপসাগর। 'আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় ওই'–বিখ্যাত গানটি চন্দ্রনাথের রূপে মুগ্ধ হয়েই লিখেছিলেন নজরুল।
বাহারের তোলা আরেকটি ছবি আছে–কর্ণফুলী নদীতে সাম্পানের ওপর সুরমগ্ন কবি। তাঁর পেছনে সাম্পান মাঝি। কবিকে বহনকারী সাম্পানের পাশ দিয়ে চলছে কয়েকটি যন্ত্র জলযান। ছবির শেষ সীমানায় নদীপারের বিস্তৃর্ণ গ্রামটি যেন পানি আর তরঙ্গের সঙ্গে মিশে গেছে। কবিকে ফ্রেমের মাঝে রেখে ক্ষুদ্র ভিউফাইন্ডারে তীক্ষ্ণ চোখ রেখে ছবিটা তুলেছেন বাহার। ব্যাকগ্রাউন্ডে মাঝি আর ফোরগ্রাউন্ডে সাম্পানের বাঁকা মাস্তুল। ছবিটার কম্পোজিশন দেখে মনে হয় ফিশআই লেন্সে তোলা।
ছবিটা দেখলে আরও একটা অদ্ভুত রকমের অনুভূতি হয়। মনে হয়, নদীর ঠান্ডা বাতাস ঝাপটা দিয়ে এসে গায়ে লাগে। এই ছবির পটভূমি সম্পর্কে জানা যায়, প্রায় বিকেলে কবিকে নিয়ে কর্ণফুলীর সাম্পান ঘাটে যেতেন বাহার। সাথে থাকত তার বন্ধুরা। কবিকে দেখে সাম্পানওয়ালারা কাছে আসত, ভিড় জমাত। সাম্পানে ওঠে সবাই মিলে সুর করে গাইতেন সাম্পানওয়ালার গান। একবার কর্ণফুলী ভ্রমণের জন্য কবি যে সাম্পানে ওঠেন, সেটি ছিল ভাঙা। একসঙ্গে সবাই সেই সাম্পানে উঠলে সেটি ডুবে যাওয়ার উপক্রম হয়।
আরেকটি ছবি আছে–শিরস্ত্রাণ পোশাকে নজরুল। ছবিটি আজীজ মঞ্জিলের ঘরের ভেতর তোলা। একটি হাতলওয়ালা চেয়ারে দুই পা ছড়িয়ে বসে আছেন কবি। পরনে ধূসর আসকান আর সাদা পায়জামা। আসকানের ওপর সাদা চাদর জড়ানো। মাথায় শিরস্ত্রাণ। ডান দিকের অসীমে কবির ভাবুক চোখ। বাঁ হাতটি চোয়ালে রাখা। কবির পেছনের বা পাশে একটি উঁচু টুলে ফুলদানিতে সাজানো পুষ্পগুচ্ছ। জানালার ফাঁক দিয়ে আসা নরম আলোয় ঘরটা আলোকিত।
খুবই স্নিগ্ধ পরিবেশে কবির এই আপাদমস্তক ছবিটা তার তারুণ্যের দীপ্তিই তুলে ধরে। আজ থেকে ঠিক এক শ বছর আগে নজরুলের সবচেয়ে স্বর্ণসময়ের এমন অনেক দুর্লভ মুহূর্ত বাহারের ক্যামেরায় ইতিহাস হয়ে আছে।
চট্টগ্রাম সফর শেষে কবি ফিরে যান কলকাতায়। সেখান থেকে কৃষ্ণনগর। কৃষ্ণনগর থেকে তিনি বাহারের সহোদরা শামসুন নাহারকে (১৯ অক্টোবর ১৯০৮-১১ এপ্রিল ১৯৬৪) চিঠি লেখেন। ১৯২৬ সালের ১১ আগস্ট লেখা চিঠিতে কবি চট্টগ্রামে তোলা ছবিগুলোর কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেন।
নাহারকে কবি লিখেছেন, 'আমার পাহাড়ে ও ঝর্ণাতলে তোলা ফোটো একখানা ক'রে পাঠিয়ে দিও। গ্রুপের ফোটো একখানা (যা'তে হেমন্তবাবু ও ছেলেরা আছে), আমি বাহার ও অন্য একটি ছেলেকে নিয়ে তোলা যে ফোটো তার একখানা এবং আমি ও বাহার দাঁড়িয়ে তোলা ফোটোর একখানা পাঠিয়ে দিও আমায়।'
কবির দীর্ঘ চিঠিজুড়ে ছিল চট্টগ্রাম সফরের মুগ্ধতা। কবি লিখেছেন, 'তোমরা আমায় বলেছ লিখতে। সে-বলা আমায় আনন্দ দিয়েছে, তাই সৃষ্টির বেদনাও জেগেছে অন্তরে। তোমাদের আলোর পরশে, শিশিরের ছোঁওয়ায় আমার মনের কুঁড়ি বিকচ (বিকশিত) হয়ে উঠেছে। তাই চট্টগ্রামে লিখেছি। নইলে তোমরা বললেই লেখা আসত না।' কবি আরও লিখেছেন, 'ফুল যদি কোথাও ফোটে, আলো যদি কোথাও হাসে, সেখানে আমায় গান-গাওয়ায় পায়, গান গাই। সেই আলো, সেই ফুল পেয়েছিলাম এবার চট্টলায়, তাই গেয়েছি গান। ওর মাঝে শিশিরের করুণা যেটুকু, সেটুকু আমার–আর কারুর নয়।'
আড়াই বছর বয়সে পিতৃহারা হয়েছিলেন বাহার। তখন নাহারের বয়স ছিল ছয় মাস। পিতার মৃত্যুর পর বাহার, নাহার ও তাদের মা চট্টগ্রামের তামাকুমুন্ডিতে এসে নানা, নানি ও এক খালার সঙ্গে বসবাস শুরু করেন। এই বাড়িতেই ১৯২৬ সালে বেড়াতে আসেন নজরুল। নজরুল এ বাড়িতে আসার কিছুদিন আগেই বাহারের নানা আবদুল আজীজ গত হন।
বাহারদের তামাকুমুন্ডির বাড়িতে নজরুল দ্বিতীয়বার আসেন ১৯২৯ সালের জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে। এ সময় তিনি চট্টগ্রাম এডুকেশন সোসাইটির প্রতিষ্ঠা উপলক্ষে অনুষ্ঠানে সভাপতির ভাষণ দেন। এ সফরে কবি সমুদ্রের ডাক উপেক্ষা করতে পারেননি; ছুটে গেছেন পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে। বাহারের বন্ধুবান্ধব নিয়ে স্টিমারে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে হাজির হয়েছেন অগ্রজ বন্ধু কমরেড মুজফ্ফর আহ্মদের সন্দ্বীপের বাড়িতে।
বাহারদের বাড়ির প্রাকৃতিক পরিবেশ কবিকে মুগ্ধ করেছিল। ১৯২৯ সালে এই বাড়িতে বসেই কবি লিখেছেন 'বাতায়ন-পাশে গুবাক-তরুর সারি' শিরোনামের বিখ্যাত কবিতাটি। কবি যে ঘরে থাকতেন তার সামনের পুকুরপাড়ে ছিল সাতটি সুপারিগাছ। জানালা দিয়ে দেখা গাছগুলোর সঙ্গে কবির সখ্য ভাব গড়ে ওঠে। চন্দ্রালোকিত রাতে পুকুরের জলে বিম্বিত সুপারি পাতার কম্পনগুলো ভালো লাগে তার।
শেষ বিদায়ের আগে, কলকাতা ফিরে যাবার ঠিক আগের রাতে কবি এই কবিতাটি লিখেন। এর আগে ১৯২৭ সালে প্রকাশিত 'সিন্ধু-হিন্দোল' বইটি তিনি বাহার ও নাহারকে উৎসর্গ করেছিলেন। উৎসর্গপত্রে কবি লিখেছেন—
'কে তোমাদের ভালো?
বাহার আন গুলশান গুল,
নাহার আন আলো
বাহার এলে মাটির রসে, ভিজিয়ে সবুজ প্রাণ,
নাহার এলে রাত্রি চিরে জ্যোতির অভিযান।
তোমরা দুটী ফুলের দুলাল, আলোর দুলালী।
এক বোঁটায় ফুটলি এসে নয়ন ভুলালি।
নামে নাগান পাইনি তোদের, নাগান পেলো বাণী,–
তোদের মাঝে আকাশ ধরা করছে কানাকানি।'
১৯২৬ সালে বাহারদের বাড়িতে নজরুল একটা রুল-টানা খাতায় কয়েকটি কবিতা লেখেন। ১৯২৯ সালেও আরেকটি রুল-টানা খাতায় তিনি বেশ কয়েকটি কবিতা ও গান রচনা করেন। খাতা দুটি তিনি বাহারদের বাড়িতেই রেখে যান। প্রায় তিন দশক কাল ধরে খাতা দুটি বাহারের আলমারিতে সংরক্ষিত ছিল। ১৯৫৩ সালে বাহার অসুস্থ হয়ে পড়লে বাহারের স্ত্রী আনোয়ারা বাহার চৌধুরী (১৩ ফেব্রুয়ারি ১৯১৯-২৭ অক্টোবর ১৯৮৭) বাহারের সব কাগজপত্র ও নজরুলের খাতা দুটি সংরক্ষণের দায়িত্ব দেন জ্যেষ্ঠ কন্যা সেলিনা বাহার জামানকে (১৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৪০-১ ডিসেম্বর ২০০৪)।
সেলিনা বাহারকে যখন এ দায়িত্ব দেওয়া হয়, তখন তিনি মাত্র দশম শ্রেণিতে পড়েন। দুটি খাতায় লেখা নজরুলের কবিতা, চিঠি ও বাহারের তোলা দুষ্প্রাপ্য ছবি দিয়ে সেলিনা বাহার জামানের সম্পাদনায় ১৯৯৪ সালের মে মাসে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হয় 'নজরুল পাণ্ডুলিপি'। এই গ্রন্থে ছাপা হয় হবীবুল্লাহ বাহার চৌধুরী, শামসুন নাহার মাহমুদ ও আনোয়ারা বাহার চৌধুরীর স্মৃতিচারণা, অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মুখবন্ধ আর সেলিনা বাহারের সম্পাদকীয়।
কবির চট্টগ্রাম সফরের বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায় হবীবুল্লাহ বাহার চৌধুরীর স্মৃতিগদ্যে। 'কাজী সাহেব' শিরোনামের সেই স্মৃতিগদ্যটি ছাপা হয়েছিল ১৯৫৭ সালে, কলকাতার সাহিত্যম প্রকাশনা থেকে বিশ্বনাথ দে সম্পাদিত 'নজরুল স্মৃতি' গ্রন্থে।
বাহার লিখেছেন, 'কাজী সাহেব চট্টগ্রামে আমাদের বাড়িতে গিয়েছেন কয়েকবার। যে কদিন তিনি ছিলেন চট্টগ্রামে, মনে হতো বাড়িখানি যেন ভেঙে পড়বে। রাত্রি দশটায় থার্মোফ্লাক্স ভরে চা, বাটাভরা পান, কালিভরা ফাউন্টেন পেন আর মোটা মোটা খাতা দিয়ে তাঁর শোবার ঘরের দরজা বন্ধ করে দিতাম। সকালে উঠে দেখতাম, খাতা ভর্তি কবিতা। এক-এক করে "সিন্ধু", "তিন তরঙ্গ", "গোপন প্রিয়া", "অনামিকা", "কর্ণফুলী", "মিলন মোহনায়", "বাতায়ন-পাশে গুবাক-তরুর সারি", "নবীনচন্দ্র", "বাংলার আজীজ", "শিশু যাদুকর", "সাত-ভাই চম্পা"–আরও কতো কবিতা লিখেছেন আমাদের বাড়িতে বসে। চট্টগ্রামের নদী, সমুদ্র, পাহাড়, আমাদের বাড়ির সুপারিগাছগুলো আজ অমর হয়ে আছে তাঁর সাহিত্যে।'
কর্ণফুলী আর সীতাকুণ্ড পাহাড়ের কথা উল্লেখ করে বাহার লিখেছেন, 'সারা রাত কবি চা আর পান খেতেন–আর খাতা ভর্তি করতেন কবিতা দিয়ে। দুপুরে কখনো কিছু পড়তেন, কখনো করতেন পামিস্ট্রির চর্চা (হস্তরেখাবিদ্যা), কখনো মশগুল হতেন দাবা খেলায়। বিকেলে দল বেঁধে যেতাম নদীতে, সমুদ্রে। সাম্পানওয়ালারা এসে জুটত, সুর করে চলত সাম্পানের গান। সবাই মিলে গান ধরতাম–"আমার সাম্পান যাত্রী না লয়, ভাংগা আমার তরী", "ওগো গহীন জলের নদী।"'
'একেক সময় চট্টগ্রামী সাম্পাওয়ালারা গাইত–"বঁধুর আমার চাটিগাঁ বাড়ি, বঁধুর আমার নন্দীর কূলে ঘর"। একেকবার বেড়াতে যেতাম ঘোড়ায় চড়ে পাহাড়ে। কখনো পরতেন তিনি আরবি পোশাক, কখনো বা ব্রিচেস। কাজী সাহেবকে নিয়ে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের পাহাড়, জঙ্গল, হ্রদ, জলপ্রপাত, খালবিল, নদী-চরে বেড়িয়েছি। সঙ্গে ছেলের দল। এত বড় বিদ্রোহী বীর, কিন্তু জোঁককে তিনি বড় ভয় করতেন। একবার সীতাকুণ্ডের পাহাড়ে উঠে জোঁকের ভয়ে আর তিনি নামতে চান না। কয়েকজন মিলে কাঁধে করে তাঁকে নামাতে হয়েছে শেষ পর্যন্ত।'
কবির সঙ্গে কেমন করে পরিচয়—প্রবন্ধের শুরুতেই সে প্রসঙ্গ তুলে ধরেন বাহার। তিনি লিখেন, 'কাজী সাহেবের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হুগলীতে। কিন্তু তার বহু আগেই তাঁকে মেনে নিয়েছি জীবন-পথের অগ্রদূত হিসেবে। হঠাৎ একদিন বন্ধুবর মঈনুদ্দীনের সঙ্গে হুগলীতে রেলের লাইনের ধারে তাঁর বাড়িতে গিয়ে হাজির হলাম। শুনলাম তিনি উত্তরপাড়ার এক সভায় গেছেন। রাত্রি ন'টার সময় তিনি ফুলের মালা গলায় পরে বাড়ি ফিরে এলেন। বিশেষ পরিচয় দিতে হলো না। দেখেই তিনি হেসে উঠলেন, যেন যুগ যুগের চেনা। উপস্থিত কেউ বুঝতেও পারল না, সেই আমাদের প্রথম পরিচয়।'
একেবারে ব্যক্তিগত বিষয়ও উঠে এসেছে বাহারের স্মৃতিচারণায়। বাহারের আত্মীয়দের প্রায় সবাই ছিলেন সরকারি চাকুরে। তাই স্বজনেরা চাইলেন আইপিএস (ইন্ডিয়ান পুলিশ সার্ভিস) পরীক্ষা দিয়ে তাকে পুলিশের বড় কর্মকর্তা হতে হবে। বাহার আইপিএস পরীক্ষায় পাস করলেন। ডাক্তারি পরীক্ষাও হয়ে গেল। শুধু ইন্ডিয়ান সেক্রেটারি অব স্টেটের মঞ্জুরি বাকি।
ভক্ত-শিষ্যদের কেউ পুলিশে চাকরি করুক–এটা অবশ্য নজরুল সহ্য করতে পারতেন না। সব শুনে নজরুল বললেন, নিযুক্তিপত্র এলে কলকাতা কংগ্রেসের সময় মঞ্চের ওপর উঠে তোমাকে পদত্যাগের কথা ঘোষণা করতে হবে। বাহার তখন নজরুলকে নিয়ে কলকাতা শহরে সভা করে বেড়াচ্ছেন। ফলে তাদের গোপন পরিকল্পনা আর গোপন রইল না। খবর চলে গেল পুলিশ কমিশনার চার্লস টেগার্টের (৫ অক্টোবর ১৮৮১-৬ এপ্রিল ১৯৪৬) কান পর্যন্ত। ফলে ব্রিটিশ পুলিশের চাকরির খাতা থেকে বাহারের নাম কেটে দিলেন টেগার্ট সাহেব।
নজরুলের চট্টগ্রাম সফরের সময় এখানকার তরুণ আর বিপ্লবীদের মনে যে বিশাল কম্পন সৃষ্টি হয়েছিল–তার প্রমাণ পাওয়া যায় শামসুন নাহার মাহমুদ, প্রখ্যাত সাহিত্যিক আবুল ফজল ও বিপ্লবী পূর্ণেন্দু দস্তিদারের স্মৃতিচারণায়। 'নজরুলকে যেমন দেখেছি' শিরোনামের স্মৃতিকথায় শামসুন নাহার মাহমুদ লিখেছেন, 'তাঁর প্রথমবার চট্টগ্রাম অবস্থানকালে যেমন তিনি মজলিস জমাতেন স্বদেশি গান দিয়ে–তেমনি দ্বিতীয়বারে শ্রোতাদের মন্ত্রমুগ্ধ করতেন গজলের সুরে সুরে। আমাদের বৈঠকখানায় বসত গানের মজলিস। কবির কণ্ঠে ঝরে ঝরে পড়ত সঙ্গীতের আনন্দ ও বেদনা।'
আবুল ফজল (১ জুলাই ১৯০৩-৪ মে ১৯৮৩) লিখেছেন, 'তাঁদের (বাহারদের) চট্টগ্রামের এই বাসাতেই নজরুল ইসলাম একাধিকবার আস্তানা গেড়েছেন, যার সবিস্তার বর্ণনা শামসুন নাহার তাঁর "নজরুলকে যেমন দেখেছি" গ্রন্থে দিয়েছেন। আমরাও মধুলুব্ধ ভ্রমরের মতো তখন ওখানে আড্ডা জমাতাম।'
পূর্ণেন্দু দস্তিদার (২০ জুন ১৯০৯-৯ মে ১৯৭১) লিখেছেন, 'নজরুল ইসলাম তখন আমাদের মতো কিশোর ও তরুণদের প্রাণে অগ্নিবীণার প্রচণ্ড ঝঙ্কার তুলেছেন। তাঁর বিদ্রোহী কবিতা তখন বিপ্লবী ও দেশপ্রেমিকদের অন্তরে সংগ্রামের এক তীব্র কামনা ও আবেগ সৃষ্টি করেছে। তাই তিনি যে ক'দিন চট্টগ্রামে বাহার সাহেবদের নন্দকাননের (পরবর্তীকালে তামাকুমুন্ডির এলাকার নাম হয় নন্দকানন) বাসায় ছিলেন সেই কয় দিন তারুণ্যের এক বিপ্লবতীর্থে পরিণত হয়েছিল। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্রোহী কবির গান ও আবৃত্তিতে তিনি আমাদের মাতিয়ে রেখেছিলেন। বারবার প্রধানত 'বিদ্রোহী' কবিতাটি আবৃত্তি করে শোনাবার জন্য বাহার সাহেবের মারফত দাবি উঠলে কবি কূলপ্লাবী হাস্যে ঘর আলোড়িত করে আমাদের দাবি পূরণ করেছিলেন। মাঝে মাঝে বাহার সাহেব কবির জন্য নিয়ে আসছিলেন চা আর পান।'
'নজরুল পাণ্ডুলিপি' গ্রন্থে সেলিনা বাহার জামানের সম্পাদকীয় পাঠে পাওয়া গেল খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি তথ্য। চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের দুই বীর সেনানী অনন্তলাল সিং (১ ডিসেম্বর ১৯০৩-২৫ জানুয়ারি ১৯৭৯) ও গণেশ ঘোষ (২২ জুন ১৯০০-২২ ডিসেম্বর ১৯৯২) ছিলেন বাহারের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। স্বদেশি আন্দোলনের এই দুই বিপ্লবী প্রতিদিন বাহারদের বাড়িতে আসতেন কবির সান্নিধ্য লাভের আশায়।
তরুণদের মনে কবি তখন অগ্নিবীণার ঝঙ্কার তুলেছিলেন। মাস্টারদা সূর্য সেন তাদের মগজে স্বাধীনতার যে বীজ বুনেছিলেন, তা বর্ধিত হয়েছে নজরুলের সান্নিধ্যে এসে। নজরুল তাদের মাঝে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন বিদ্রোহের মূলমন্ত্র। তারই পরিণাম ১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক অস্ত্রাগার লুণ্ঠন।
বাহারপত্নী আনোয়ারা বাহার চৌধুরীর স্মৃতিচারণামূলক প্রবন্ধ থেকে জানা যায়, দেশভাগের পর ১৯৪৭ সালে বাহার ও তার পরিবার কলকাতা ছেড়ে ঢাকায় চলে আসেন। ১৯৫৬ সালে তিনি কবিকে দেখতে কলকাতায় যান। কবি তখন নির্বাক। এরপর ১৯৬২ সালের অক্টোবর মাসে বাহার সপরিবারে আজমির শরিফ যান। তিনি তখন বেশ অসুস্থ। ব্লাডপ্রেশার স্ট্রোক হয়ে কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছেন।
আজমির থেকে কলকাতা পৌঁছে বাহার গেলেন কবির বাসায়। কবির পরনে সিল্কের পাঞ্জাবি ও পায়জামা। বিছানায় বসে অনবরত কাগজ ছিঁড়ে বালিশের নিচে রাখছেন। বাহারকে দেখেই কবি উঠে এসে ড্রয়িংরুমের সোফায় বসলেন। বাহার বললেন–'কাজীদা, কাজীদা কেমন আছেন? আমাকে চিনতে পারছেন না?'
কবি কোনো কথা বললেন না, ক্রমাগত একটি মাসিক পত্রিকার পাতা উল্টাতে লাগলেন। একটু পরেই কবি উঠে গিয়ে তাঁর ঘরের বিছানায় বসলেন। বিছানার ওপর প্রমীলা দেবীর একটি বাঁধানো ছবি। কিছুদিন আগেই তার মৃত্যু হয়েছিল। ছবিটি সামনে রেখে কবি কাগজ ছিঁড়তে লাগলেন।
বাহার আবার গিয়ে ডাকলেন, 'কাজীদা, কাজীদা, কথা বলছেন না কেন? আমাকে চিনতে পারছেন না কাজীদা? আমি বাহার, কথা বলুন কাজীদা, কথা বলুন'–কান্নায় উদ্বেলিত হয়ে তিনি কবির ডান হাতটি নিজের হাতে তুলে নিলেন। কবি একমুহূর্তের জন্য তাঁর দিকে তাকালেন। মনে হল পূর্বস্মৃতি ফিরে পেয়েছেন। চোখের তারায় সে রকমই আভাস পাওয়া গেল। কিন্তু না। পরমুহূর্তেই হাতটা টেনে নিয়ে আবার কাগজ ছিঁড়তে শুরু করলেন।
বাংলাদেশের আলোকচিত্রশিল্পের জন্য হবীবুল্লাহ বাহার যে অবদান, তার ঋণ কোনো দিন শোধ করার নয়। এ দেশে ফটোগ্রাফির সাংগঠনিক ভিত তৈরিতে তিনি সবার আগে এগিয়ে এসেছিলেন। দেশভাগের পর তিনি যখন পাকিস্তান সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী, তখন জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের সচিব জি এ ফারুকী, বার্মা শেলের নির্বাহী কর্মকর্তা ইউসুফ মোহাম্মদ প্যাটেল, মাই স্টুডিওর স্বত্বাধিকারী হিমাংশু দত্ত, জায়েদি ফটোগ্রাফার্সের স্বত্বাধিকারী সাগীর আলী জায়েদি, রয়্যাল ফটোগ্রাফিক সোসাইটির ফেলো আজমল হক, প্রখ্যাত আলোকচিত্রশিল্পী আমানুল হক ও ফজলে হোসেনকে সঙ্গে নিয়ে ইস্ট পাকিস্তান ফটোগ্রাফিক সোসাইটি (ইপিপিএস) গড়ে তোলেন। ইস্ট পাকিস্তান ফটোগ্রাফিক সোসাইটির আগে এ দেশে ফটোগ্রাফির কোনো সংগঠন ছিল বলে ইতিহাসে তার প্রমাণ মেলে না।
শত বছর আগে বাহারের তোলা নজরুলের ছবিগুলো কেমন করে পোকার কবল থেকে রক্ষা পেল, তার একটি আভাস পাওয়া যায় আলোকচিত্রশিল্পী আমানুল হক রচিত 'স্মৃতিচিত্র : আলেখ্য ও আলোকচিত্র বইয়ে'। 'বাঁশিওয়ালা নজরুল' শিরোনামের প্রথম প্রবন্ধেই আমানুল তুলে ধরেন নজরুলের ঐতিহাসিক ছবিগুলো প্রিন্ট করার গল্প। অসুস্থ হয়ে পড়ার কিছুদিন আগে বাহার নজরুলের বাঁশি বাজানোর নেগেটিভসহ চারটি নেগেটিভ আমানুলকে দেন বড় সাইজে প্রিন্ট করার জন্য। নেগেটিভগুলোর অবস্থা খুবই সঙ্গিন।
বাশি বাজানোর নেগটিভটি পোকায় কাটা। পুরোনো নেগেটিভ থেকে বহু চেষ্টায় বিশাল সাইজের একটি ছবি প্রিন্ট করেন আমানুল। দেশ স্বাধীনের পর কবিকে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হলো। ধানমন্ডির কবি ভবনে বার্ধক্যপীড়িত নজরুল তখন সম্পূর্ণ সম্বিতহীন। একদিন সেই ছবি নিয়ে আমানুল গেলেন কবি ভবনে। ছবিটি দেখিয়ে কবির চৈতন্য ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করলেন। সারা দিন চেষ্টা করেও কবির কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া গেল না। শেষে তারুণ্যদীপ্ত ছবিটা ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে নির্বাক নজরুলের বেশ কিছু ছবি তুললেন। সেদিন ফ্রেমে বাঁধানো ছবিটা কবি ভবনেই রেখে আসলেন আমানুল।
এই গল্পটা আমি প্রখ্যাত আলোকচিত্রশিল্পী নাসির আলী মামুনকে বললাম। তিনি বললেন, 'কবির এই ছবিটা নজরুল ইনস্টিটিউটের জাদুঘরে রাখা আছে। আমি নিজের চোখে দেখেছি। লাইফ সাইজ ছবি। ছবিতে ক্যাপশনও লেখা আছে।'
নাসির আলী মামুনের কথা শুনে অস্থির হয়ে কবির বাঁশি বাজানোর মূল ছবিটি দেখতে ১৮ মে দুপুরের পর নজরুল ইনস্টিটিউটে গেলাম। দেখা করলাম ইনস্টিটিউটের গবেষণা ও প্রকাশনা বিভাগের সহকারী পরিচালক রবিউল ইসলামের সঙ্গে। শুনলাম, তিনি এই প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে পুরোনো মানুষ। তার কাছে ছবিটি সম্পর্কে জানতে চাইলাম।
তিনি জানালেন, এই ছবি সম্পর্কে তিনি কিছু জানেন না! নজরুলের লাইফ সাইজ ছবিটি দেখতে না পারার বেদনা নিয়ে যখন ফিরছি, তখন মেঘগম্ভীর আকাশটা হঠাৎ কালো হয়ে এল।
