সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে, ভাসমান কৃষি পুনরুজ্জীবিত করছেন বাংলাদেশের কৃষকরা
মোহাম্মদ মোস্তফা। বিশ্বের বৃহত্তম বদ্বীপ বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বাসিন্দা। পেশায় কৃষক। কিন্তু এই নিম্নভূমিতে ক্রমেই বাড়ছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা। বাড়ছে বন্যাও। এতে পানিতে তলিয়ে যাওয়ার হুমকিতে থাকা কৃষিজমির পরিমাণও ফি বছরই বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে পূর্বপুরুষদের ভাসমান ভেলায় ফসল ফলানোর পদ্ধতি ফের আঁকড়ে ধরেছেন মোস্তফা।
দীর্ঘমেয়াদী জলাবদ্ধতার কারণে বাংলাদেশের কৃষক পরিবারগুলোর জন্য নিজেদের খাদ্য উৎপাদন করা কঠিন হয়ে পড়ছে। এ কারণে শসা, মূলা, করলা, পেঁপে ও টমেটো ফলানোর নিরাপদ স্থান হিসেবে ভেলাকে বেছে নেওয়া পরিবারের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। এসবের বেশিরভাগই চারা হিসেবে বিক্রি হয়।
ভাসমান ভেলা বা বেড তৈরি করা হয় মূলত কচুরিপানা দিয়ে। এছাড়া টোপাপানা, শেওলা, নানা জলজ আগাছা, দুলালিলতা, ধানের খড় বা ফসলের অবশিষ্টাংশ, আখের ছোবড়া প্রভৃতি ব্যবহার করেও ভাসমান বেড তৈরি করা হয়। বৈরী বর্ষা মৌসুমে—বিশেষ করে যখন শুকনো জমি খুঁজে পাওয়া দুষ্কর—এই ভাসমান ভেলাগুলো হয়ে ওঠে পরিবারগুলোর ত্রাতা।
২০০ বছরের প্রাচীন এই পদ্ধতিটি এই অঞ্চলের কৃষকরা নিজেদের প্রয়োজনেই উদ্ভাবন করেছিলেন। বর্ষাকালে তারা এই পদ্ধতিতে চাষবাস করতেন। শুরুর দিকে বছরে প্রায় পাঁচ মাস তাদের চাষের জমি পানিতে তলিয়ে থাকত। কিন্তু এখন এ অঞ্চলের চাষের জমি ৮ থেকে ১০ মাস পর্যন্ত পানিতে তলিয়ে থাকছে; সেইসঙ্গে তলিয়ে যাওয়া জমির পরিমাণও বাড়ছে।
নিজের ভাসমান বেডে চারা রোপণ করতে করতে ৪২ বছর বয়সি মোস্তফা বলছিলেন, 'আজকাল জমি আগের চেয়ে অনেক বেশিদিন পানির নিচে থাকে। এই প্রাচীন পদ্ধতি আমাদের পেট চালাতে সাহায্য করছে।
'আমার বাবা আর পূর্বপুরুষরা এভাবে চাষ করতেন। কিন্তু কাজটা খুব সহজ না। প্রথমে আমি ফল বিক্রি করে ভাগ্য ফেরানোর চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু উল্টো দেনায় পড়ে যাই। এরপর পাঁচ বছর আগে আমি ভাসমান কৃষিকাজ করে কপাল ফেরানোর চেষ্টা করি। সেটাই আমার জীবন বদলে দেয়।'
ছয় সদস্যের পরিবারে মোস্তফাই একমাত্র উপার্জনকারী।
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ৬ হাজার কৃষক এখন এই পদ্ধতিতে চাষ করে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় এবং বর্ষাকাল আগের চেয়ে অনিয়মিত হয়ে পড়ায় ভাসমান কৃষির এই পদ্ধতিটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
পিরোজপুর জেলার নাজিরপুর উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা দিগ্বিজয় হাজরা বলেন, ৫ বছর আগে সাড়ে ৪ হাজার পরিবার ভাসমান কৃষি পদ্ধতিতে চাষ করত। সেই হিসাবে পাঁচ বছরে এ পদ্ধতি অবলম্বনকারীর সংখ্যা বেড়েছে দেড় হাজার।
পাঁচ বছর আগে পিরোজপুর জেলায় মোট ১২০ হেক্টর জমিতে ভাসমান কৃষিকাজ করা হতো। পাঁচ বছরের ব্যবধানে এখন মোট ১৫৭ হেক্টর জমিতে ভাসমান কৃষি করা হয়।
দিগ্বিজয় হাজরা বলেন, 'প্রথাগত কৃষিকাজের চেয়ে এই পদ্ধতিতে জায়গা কম লাগে। এতে কীটনাশকও লাগে না। আমরা যখন বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবের সঙ্গে লড়াই করছি, সেই মুহূর্তে ভাসমান কৃষিই আমাদের ভবিষ্যৎ হতে পারে।'
জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর অন্যতম বাংলাদেশ। ঝড়, বন্যা ও নদীভাঙনের ফলে এদেশের পানির উচ্চতা ক্রমেই বাড়ছে।
টেকটোনিক প্লেটের নড়াচড়ার কারণে বাংলাদেশের ভূমি আরও নিচু হয়ে যাচ্ছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে উজানের বাঁধ। এসব বাঁধের কারণে ভাঙনরত এই বদ্বীপে পলিমাটি আসা বাধাগ্রস্ত করছে। এসবের ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব আরও খারাপের দিকে গেছে।
অলাভজনক সংস্থা জার্মানওয়াচ-এর প্রস্তুত করা গ্লোবাল ক্লাইমেট রিস্ক ২০২১-এ জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া দেশগুলোর র্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশ সপ্তম স্থানে ছিল।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ২০২১ সালের এক প্রতিবেদন বলে, 'বিশ্বের বৃহত্তম বদ্বীপ হওয়ায়…বাংলাদেশের স্থলভূমির বিরাট একটি অংশ ঘনঘন বন্যা, বিশেষ করে আকস্মিক বন্যার সঙ্গে নদীভাঙনের শিকার হয়।'
বঙ্গোপসাগরে উৎপত্তি হওয়া ঘূর্ণিঝড়ও প্রায়ই বাংলাদেশে আঘাত হানে। এছাড়া বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৃষ্টিপাতও এদেশে অনেক অনিয়মিত ও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা সাড়ে ১৬ কোটি। মোট জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশেরও বেশি (৪ কোটির বেশি মানুষ) উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দা।
২০১৯ সালের আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও উপকূলীয় অঞ্চল তলিয়ে যাওয়ার কারণে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ তার মোট ভূমির ১৭ শতাংশ হারাতে পারে। আর এ সময় নাগাদ দেশের খাদ্য উৎপাদন কমতে পারে ৩০ শতাংশের মতো।
মোস্তফা জানালেন, ভাসমান কৃষির সুবাদে তিনি এখন 'কারও কাছে সাহায্য না চেয়েই' পরিবারের মুখে খাবার তুলে দিতে পারছেন।
কিন্তু সবকিছুর ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় লাভের মার্জিন কমে যাচ্ছে বলে জানান মোস্তফা। এ বছর তিনি নতুন ভেলা বানানোর জন্য এক নৌকাভর্তি ১.২ টন কচুরিপানা কিনেছেন সাড়ে ৪ হাজার টাকা দিয়ে। অথচ গত বছর তার ব্যয় হয়েছিল মাত্র ১ হাজার টাকা।
ভাসমান বেড বানাতে দুই মাস সময় লাগে। একেকটি বেড সাধারণত দৈর্ঘ্যে ৬ মিটার ও প্রস্থে ১ মিটারের মতো হয়। তবে কখনও কখনও এর কয়েকগুণ লম্বাও হতে পারে বলে জানান কৃষকরা। তিন থেকে চার মাস পর নতুন বেড বানাতে হয়।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের আরেক কৃষক মোহাম্মদ ইব্রাহিম বলেন, ভাসমান বেডে তিনি নির্ভরযোগ্যভাবে বেশি পরিমাণে ফসল ফলাতে পারছেন।
একটি নৌকায় বসে ভাসমান বেডে ফলানো লাউয়ের চারা বিক্রি করতে করতে ৪৮ বছর বয়সি এই কৃষক বলছিলেন, 'পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমার এখনও মনে আছে, সাধারণ জোয়ারের সময় এখন যে জমি পানিতে তলিয়ে যায়, ছোটবেলায় সেখানে আমরা ফুটবল খেলতাম।'
ইব্রাহিমের স্ত্রী, ৩৫ বছর বয়সি মুরশিদা বেগম দিনে আট ঘণ্টার বেশি কাজ করে ভাসমান বেডে রোপণের জন্য চারার বল তৈরি করেন। কিন্তু কচুরিপানার কারণে তার প্রায়ই চুলকানি হয় এবং হাতের তালু ও আঙুলে ঘা হয়ে যায়।
৩০ বছর বয়সি কাজল বেগম দুই মেয়ের মা। তিনি বলেন, 'কাজটা ভীষণ কঠিন আর যন্ত্রণাদায়ক। কোমরের ব্যথায় রাতে আমার ঘুম হয় না। কিন্তু বছরের বেশিরভাগ সময়ই যখন সব জায়গায় পানি থাকে, তখন এছাড়া আর কোন কাজটা করব?'