‘ডাবল ভ্যারিয়েন্ট’ বলতে কী বোঝায়? ভারতে দেখা মেলা ভাইরাসের নতুন এই ধরন কাদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ?
করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ওয়েভের ধাক্কায় বিপর্যস্ত জনবহুল দেশ ভারত। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দেশটিতে আশঙ্কাজনহারে সংক্রমণ বেড়ে চলেছে। একইসঙ্গে হু হু করে বাড়ছে মৃতের সংখ্যা। বর্তমানে, দেশটিতে কোভিড-১৯ সংক্রমণে দৈনিক শনাক্তের হার আড়াই লাখের বেশি।
এর আগে ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং ইরানে দেখতে পাওয়া তীব্র করোনা পরিস্থিতির সঙ্গে ভারতের বর্তমান পরিস্থিতির মিল পাওয়া যায় বলে জানান স্ক্রিপস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সংক্রমণ ব্যাধিবিষয়ক বিজ্ঞানী ক্রিশ্চিয়ান অ্যান্ডারসন। তিনি বলেন, 'এই দেশগুলোতে ইতোমধ্যে প্রথম ওয়েভ চলাকালে বহু মানুষ সংক্রমিত হয়েছেন। ধারণা করা হচ্ছিল, দেশগুলো গোষ্ঠী অনাক্রম্যতা বা হার্ড ইমিউনিটি অর্জনের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।' কিন্তু এরপর, সময়ের সঙ্গে মানুষের দেহের অভ্যন্তরীণ সুরক্ষা ব্যবস্থা হ্রাস পেতে থাকায় এবং ভাইরাসের আরও অধিক সংক্রামক ধরনের আগমণে আরেকটি ঢেউ জেগে উঠেছে।
'আমার ধারণা, ভারতে এটিই ঘটেছে,' বলেন অ্যান্ডারসন।
ভারতে সংক্রমিত নতুন ধরনের মধ্যে 'ডাবল মিউট্যান্ট' হিসেবে পরিচিত ভাইরাসের ধরনটি সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এখন পর্যন্ত এই ধরন বা ভ্যারিয়েন্ট সম্পর্কে যা জানা গেছে, সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
নতুন ধরনটিকে মানুষ 'ডাবল ভ্যারিয়েন্ট' বলছে কেন?
আনুষ্ঠানিকভাবে কোভিড-১৯ ভাইরাসের এই নতুন ধরন 'B.1.617' নামে পরিচিত। তবে গণমাধ্যমসহ বহু মানুষ ধরনটিকে 'ডাবল মিউট্যান্ট' বলছে। B.1.617-কে এই নামে ডাকার কারণ, এখানে অন্য দুটি অখ্যাত স্ট্রেইনের ঘটে যাওয়া প্রধান বিবর্তন বা মিউটেশন মিলিতভাবে ঘটেছে।
তবে অ্যান্ডারসন বলেন, "বৈজ্ঞানিকভাবে 'ডাবল মিউট্যান্ট' কথাটি অর্থহীন। সার্স-কোভ-২ ভাইরাসটি প্রতি মুহূর্তে পরিবর্তিত হতে থাকে। সুতরাং, সব জায়গাতেই অসংখ্য ডাবল মিউটেশনযুক্ত ভাইরাস আছে। ভারতের ধরনটিকে প্রকৃতঅর্থে এই নামে ডাকা ঠিক নয়।"
উদ্বেগ সৃষ্টি করা অন্যান্য ভ্যারিয়েন্টের মতোই B.1.617 কেবলমাত্র দুইবার অভিযোজিত নয়, বরং ভ্যারিয়েন্টটিতে ডজনখানেকের চেয়েও বেশিবার মিউটেশন ঘটে গেছে।
তবে ধরনটিকে ডাবল মিউট্যান্ট বলার পেছনে অন্য একটি কারণও আছে। প্রথমত, B.1.617-এ যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় প্রভাববিস্তারকারী বিশেষ একটি স্ট্রেইনের (L452R) বিবর্তন বিদ্যমান। দ্বিতীয়ত, দক্ষিণ আফ্রিকা (E484Q) এবং ব্রাজিলে (E484K) প্রথম পাওয়া যায়- এমন মিউটেশনও এখানে উপস্থিত আছে। E484Q মিউটেশন E484K মিউটেশনের অনুরূপ।
সুতরাং, সংক্ষেপে B.1.617 দুটি 'বিখ্যাত' মিউটেশন ঘটেছে। তবে, এ দুটি ছাড়াও ভ্যারিয়েন্টটিতে আরও ১১টি ভিন্ন মিউটেশন উপস্থিত আছে।
নতুন এই ধরন কি 'দ্বিগুণ উদ্বেগজনক'? অধিক সংক্রামক?
প্রাথমিক প্রমাণাদি অনুযায়ী, B.1.617 ভাইরাসের পুরনো সব স্ট্রেইনের তুলনায় অধিক সংক্রামক। মঙ্গলবার (২০ এপ্রিল) প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, L452R মিউটেশন মানব কোষে ভাইরাসের সংক্রমণ ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে পারে। ক্যালিফোর্নিয়ার ধরনটিতে একই ধরনের মিউটেশন উপস্থিত থাকায় তা ভাইরাসের পুরনো সব ভ্যারিয়েন্টের চেয়ে ২০ গুণ বেশি সংক্রমণ ছড়াতে সক্ষম।
ভারতে খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে B.1.617। 'ন্যাচার' সাময়িকীর নিবন্ধ অনুযায়ী, গত কয়েক মাসে মহারাষ্ট্রে নতুন এই ধরন প্রভাববিস্তারকারী স্ট্রেইনে রূপান্তরিত হয়েছে।
তবে অ্যান্ডারসন জানান, কেউ নিশ্চিতভাবে জানে না B.1.617 আসলেই অধিক সংক্রামক কি না। আর তাই ভারতের নতুন ঢেউয়ের পেছনেও এই ভ্যারিয়েন্ট দায়ী, এমন কথা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব না।
"আমরা জানি, যুক্তরাজ্যে প্রথম শনাক্ত হওয়া 'B.1.617' ধরনটিও ভারতে ছড়িয়ে পড়েছে। এছাড়া ব্রাজিলে প্রথম চিহ্নিত হওয়া 'P.1.' ধরন ভারতে সংক্রমণ ছড়াচ্ছে। সুতরাং, নতুন ওয়েভ ছড়িয়ে পড়ার পেছনে এই ধরনগুলোর ভূমিকাও থাকতে পারে। তবে আমাদের কাছে আসলে এখন পর্যন্ত পর্যাপ্ত তথ্য নেই," বলেন অ্যান্ডারসন।
বি-ওয়ান-সিক্সসেভেনটিনের বিরুদ্ধে ভ্যাকসিন কাজ করবে?
একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, মানব দেহের প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে প্রতিহত করতে ভাইরাসের সক্ষমতা বৃদ্ধির পেছনে নতুন এই ধরনের প্রধান দুই মিউটেশন সম্পর্কিত। সুতরাং, B.1.617-এর বিরুদ্ধে ভ্যাকসিনের কাজ করার সম্ভাবনা থাকলেও, তা সম্ভবত কম কার্যকরী হবে বলে মনে করেন ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটির গবেষক রবি গুপ্তা। এই টুইটে তিনি লিখেন, 'ভ্যাকসিন সম্ভবত গুরুতর অবস্থা এবং মৃত্যুর বিরুদ্ধে সুরক্ষা দিবে। তবে, দুর্বল প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তিদের মধ্যে সংক্রমণ রোধে ভ্যাকসিনের কাজ করার সম্ভাবনা কম।'
গুপ্তা আরও লিখেন, যারা ইতোমধ্যে কোভিড-১৯ আক্রান্ত হয়েছেন, তাদেরকেও নতুন এই স্ট্রেইন সহজেই পুনরায় আক্রান্ত করতে পারে। বিশেষত, সময়ের সঙ্গে তাদের পূর্বের প্রাকৃতিক প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ায় সংক্রমণ ঝুঁকি বাড়ে। অর্থাৎ, ভারতের নতুন ঢেউয়ের উত্থানের পেছনে পুনঃসংক্রমণ দায়ী হতে পারে।
'২০২০ সালে ভারতে সীমিত পর্যায়ে সামাজিক দূরত্ব রক্ষার পদক্ষেপের মাধ্যমেই সংক্রমণ সংখ্যা কমানো সম্ভব হয়েছিল। কিন্তু ঘটনাটি সংক্রমণে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের সংখ্যা কমার সাথে সম্পর্কিত কি না, তা আমাকে দুশ্চিন্তায় ফেলেছে। কেননা, প্রথম ওয়েভে অসংখ্য ভারতীয় সংক্রমিত হওয়ার মাধ্যমে প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করেছেন। কিন্তু B.1.617 এবং B.1.1.7-এর আধিপত্য বিস্তার থেকে ফাঁকি দিতে না পারায় এবং দেহের প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ায় দ্বিতীয় এই ওয়েভ বিস্তার লাভ করেছে,' বলেন গুপ্তা।
যদি B.1.617 পুনঃসংক্রমণের সম্ভাবনা বৃদ্ধি করে কিংবা টিকাগ্রহণকারীদের মধ্যেও সংক্রমণ ছড়াতে সক্ষম হয়, তাহলে বিশ্বের অন্যান্য অংশেও নতুন এই ধরন আশঙ্কাজনকহারে সংক্রমণ বৃদ্ধি করতে পারে। বিশেষত, বিশ্বের যেসব জনগোষ্ঠীর প্রাকৃতিক কিংবা ভ্যাকসিনের মাধ্যমে অর্জিত সুরক্ষা ব্যবস্থা কমে যাচ্ছে, তাদের জন্য ধরনটি অধিক ঝুঁকিপূর্ণ।
- সূত্র: এনপিআর