মাসুমা আলীজাদা: দুঃসাহসী সাইক্লিস্ট হয়ে উঠেছেন আফগান নারীদের অনুপ্রেরণা
চলতি সপ্তাহে অলিম্পিকে অভিষেক ঘটাতে চলেছেন আফগান সাইক্লিস্ট মাসুমা আলীজাদা।
মাসুমা যখন জাপানের ফুজি পর্বতমালার ২২ কিলোমিটার দীর্ঘ পথে সাইক্লিংয়ে নামবেন, তখন কাবুলে বসে তার হয়ে গলা ফাটাবেন একদল দুঃসাহসী নারী সাইক্লিস্ট। গভীর আগ্রহে টিভির সামনে তারা মাসুমার সাইক্লিং দেখতে বসবেন।
আফগান সাইক্লিং ফেডারেশনের মহিলা বিভাগের সহকারী উন্নয়ন পরিচালক জাহলা সারমাত বলেছেন, "ওর জন্য আমি এবং দলের সব সদস্য সত্যিই খুব গর্বিত। ওর রেস দেখার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি আমরা। আশা করছি ও খুব ভালো করবে।"
জাহলা ও অন্যান্য আফগান নারী সাইক্লিস্টদের জন্য মাসুমা আলীজাদা এক বিশাল অনুপ্রেরণার নাম। যদিও সাইক্লিংয়ের জন্য মাসুমাকে আফগানিস্তান ছেড়ে ফ্রান্সে আশ্রয় নিতে হয়েছে। টোকিও অলিম্পিকে তিনি শরণার্থী অলিম্পিক দলের হয়ে অংশ নিয়েছেন।
২১ বছর বয়সী সারমাত দেশে ও দেশের বাইরে অনেক প্রতিযোগিতায় মাসুমার সঙ্গে সাইক্লিং করেছেন। দ্য গার্ডিয়ানকে সারমাত বলেন, "মাসুমা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে জিনিসটার প্রতিনিধিত্ব করছে সেটা হলো আফগানিস্তানে নারীর ক্ষমতায়ন। শুধুমাত্র মেয়ে হওয়ার কারণে ওকে অসংখ্য বাধা-বিপত্তির মুখ পড়তে দেখেছি আমি। ও যে এত দূর আসতে পেরেছে, সেজন্য আমি গর্বিত।"
আফগানিস্তান যখন অস্থির এক সময় পার করছে, ঠিক তখনই আলোচনায় এলেন মাসুমা আলীজাদা। দেশটি থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণার পরপরই সেখানে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। ইতোমধ্যে প্রায় সব ব্রিটিশ ও আমেরিকান সেনাই আফগানিস্তান ছেড়েছে। সহিংসতা শুরু করেছে তালেবানরা। গুরুত্বপূর্ণ অনেক জেলা, প্রাদেশিক রাজধানী ও সীমান্ত অঞ্চলই চলে গেছে তালেবানের দখলে। বেশ কয়েকটি বড় হামলাও চালিয়েছে তালেবান যোদ্ধারা।
মার্কিন গোয়েন্দাদের ধারণা, মাস ছয়েকের মধ্যেই তালেবানের হাতে আফগান সরকারের পতন ঘটবে। আফগানিস্তানে তালেবানরা ক্ষমতায় এলে সবচেয়ে বেশি দমন-পীড়নের শিকার হবে নারীরা। আফগান নারীদের তাই প্রতি মুহূর্ত কাটছে নিঃসীম আতঙ্কে। তালেবানরা ইতোমধ্যে তাদের যোদ্ধাদের সঙ্গে বিয়ে দেবার জন্য কিছু অঞ্চলে ১৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সী অবিবাহিত নারী ও বিধবাদের তালিকা চেয়েছে। এ পরিস্থিতিতে আফগানিস্তানের নারী সাইক্লিস্টদের ভবিষ্যৎ এখন ঘোর অনিশ্চয়তায়।
নারী দলের অধিনায়ক, ২৪ বছর বয়সি রুখসার হাবিবজাই বলেছেন, "আমি নিশ্চিত, তালেবান আর ওদের মতো অন্যরা (আইএস) কখনও মেয়েদের পড়াশোনা, কাজ বা চাকরি করতে দেবে না। সেখানে আমাদের সাইকেল চালাতে দেবে—তা কী করে সম্ভব? আমি একশোভাগ নিশ্চিত, ওরা আমাদের কক্ষনো সাইকেল চালাতে দেবে না। ওরা আমাদের স্রেফ গুলি করে মেরে ফেলবে।'
নয় বছর বয়সে সাইক্লিংয়ের প্রেমে পড়েন গজনি প্রদেশে বেড়ে ওঠা হাবিবজাই। সাইক্লিং তার 'আত্মার খোরাক'। সেই নয় বছর বয়স থেকে সাইক্লিং তার জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে।
২০১২ সালে হাবিবজাইয়ের পরিবার কাবুলে চলে আসে। পরিবারের বড়রা প্রথমে হাবিবজাইয়ের নিরাপত্তার কথা ভেবে তাকে সাইকেল চালাতে দিতে চাননি। তাদের এ ভয় অমূলক ছিল না। আফগানিস্তানে মেয়েরা সাইকেল নিয়ে বাইরে বেরোলেই মৌখিক ও শারীরিক হয়রানির শিকার হন।
হয়রানির স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে হাবিবজাই বলেন, "পুরুষরা, বিশেষ করে যারা আমাদের জীবনে প্রথম সাইকেল চালাতে দেখতো, তারা আমাদের দিকে পাথর ছুড়ে মারত। ওদের গাড়ি দিয়ে আমাদের ধাক্কা দিত।"
"রাস্তার পাশের দোকানদাররা আমাদের দিকে শাক-সবজি ছুড়ে মারত। আলু, আপেল এবং আরও অনেক কিছুর ঢিল খেয়েছি আমি। হাতের কাছে যা পেত, তা দিয়েই ঢিল ছুড়ত ওরা। আর খুব আপত্তিকর ভাষায় গালি দিত আমাদের। তাই মাঝে মাঝে মেয়ে হয়ে জন্মানোর জন্য নিজেদের নিয়ে আমরা খুব লজ্জা পেতাম।"
বাধা-বিপত্তি এড়ানোর জন্য অনেক মেয়ে সাইক্লিস্ট ভোরে সাইকেল নিয়ে বের হয়। ভোর ৫টা থেকে সকাল ৮টা পর্যন্ত সাইকেল চালায় তারা।
একবার সাইক্লিং করতে গিয়ে বিপদে পড়েছিলেন সারমাত। "একবার আমার ওপর হামলা চালানো হয়েছিল। তখন রমজান মাস। রোজা রেখে ক্লান্ত থাকতাম। তাই গরম আবহাওয়ায় দিনের বেলায় সাইক্লিংয়ে যেতে পারতাম না। সেজন্য ইফতারের পর বের হতাম আমরা। এক রাতে আমার দলের এক পুরুষ সাইক্লিস্টের সঙ্গে বেরিয়েছিলাম। রাস্তায় দুটো ছেলের সামনে পড়ে যাই…ওদের একজন আমাকে ধাক্কা মেরে সাইকেল থেকে ফেলে দেয়।"
সব ধরনের বাধা, পরিবারের আপত্তি এবং অপরিচিতদের হয়রানি সত্ত্বেও আফগানিস্তানে নারীদের মধ্যে সাইক্লিংয়ের জনপ্রিয়তা বেড়েছে। এক দশকের মধ্যে দেশটির সাইক্লিং ফেডারেশনের নারী সদস্যের সংখ্যা বেড়ে ২২০-এ দাঁড়িয়েছে। এমনকি সাতটি প্রাদেশিক নারী দলও হয়েছে। প্রতি গ্রীষ্মে কাবুলে নারীদের বার্ষিক সাইক্লিং প্রতিযোগিতাও হয়। হাবিবজাই বলেন, স্রেফ জাতীয় দলের অংশ হওয়ার জন্য নারীরা সাইক্লিং করেন না। মেয়েরা সাইক্লিং করেন এ কাজে তারা আনন্দ পান বলে।
তবে আফগান নারীদের অগ্রগতি এখন সরু সুতোর ওপর ঝুলছে।
দু-মাস ধরে সাইক্লিংয়ের জন্য রাজধানীর বাইরে যেতে পারছেন না হাবিবজাই। আগে তিনি রাজধানী ছাড়িয়ে দূর-দূরান্তে চলে যেতেন সাইকেল চালিয়ে। বাগরাম পর্যন্তও গেছেন অনেকবার। কিন্তু এখন তার দিন কাটছে চরম নিরাপত্তাহীনতায়। সাইক্লিংয়ের সুযোগ ধীরে ধীরে কমে আসায় চরম হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন তিনি।
হাবিবজাই বলেন, 'আমার আর অন্য মেয়েদের জন্য এখন সাইকেল চালানো খুব কঠিন। মার্কিন বাহিনী ফিরে যাওয়া ঘোষণা দেওয়ার পর থেকে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে গেছে। সত্যি বলতে কী, আমরা বিপদে আছি।'
আফগানিস্তানের ইউএন অ্যাসিস্ট্যান্স মিশন-এর তথ্য অনুযায়ী, এ বছরের প্রথম চার মাসে দেশটিতে হতাহতের সংখ্যা ১ হাজার ৭৮৩ জন (নিহতের সংখ্যা ৫৭৩, আহতের সংখ্যা ১,২১০)। যা ২০২০ সালের একই সময়ের তুলনায় ২৯ শতাংশ বেশি। নারী ও শিশুদের মধ্যেও হতাহতের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।
আফগানিস্তানে যেসব নারী তাদের অধিকার নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য দিচ্ছেন, তাদেরকে টার্গেট করে হত্যার আশঙ্কা দিন দিন বাড়ছে। সারমাত জানান, আফগান নারী সাইক্লিং দলের সদস্যরা পরিচিত মুখ। কারণ এ খেলায় তারাই আফগানিস্তানে পথিকৃত। সে কারণে এই মেয়েদের এখন প্রশিক্ষণের জন্য বাইরে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
হাবিবজাই ও সারমাত ভবিষ্যতে বড় কিছু করার স্বপ্ন দেখেন। হাবিবজাই ডেন্টিস্ট হওয়ার জন্য পড়াশোনা করছেন। সম্প্রতি শুধু মেয়েদের জন্য চিতা সাইক্লিং ক্লাব চালু করেছেন তিনি। সারমাত এখন আফগানিস্তান ও সিঙ্গাপুরে সময় ভাগাভাগি করে থাকছেন। তার ইচ্ছা জ্যোতিঃপদার্থবিজ্ঞান নিয়ে পড়বেন।
দুজনেই সাইক্লিং চালিয়ে যেতে চান। আগামীদিনের আফগানিস্তান তাদের সাইক্লিংয়ের জন্য নিরাপদ থাকবে কি না, সেটি ভিন্ন প্রশ্ন। তার আগ পর্যন্ত তাদের সাইক্লিং একটি দুঃসাহসী ও বৈপ্লবিক কাজই হয়ে থাকবে।
হাবিবজাই বলেছেন, 'আমরা যখন সাইকেল চালিয়ে শহরে ঘুরে বেড়াই, আশপাশের মেয়ে আর বয়স্কা মহিলাদের খুব অনুপ্রাণিত দেখায়। আমাদের সাইক্লিং আসলে চার দশক ধরে যুদ্ধে জর্জরিত এক দেশে শান্তির প্রতীক হয়ে উঠেছে। এ দেশে মেয়েদের গাড়ি চালানোর অধিকারও ছিল না, কিন্তু আমরা সাইকেল চালাচ্ছি।'
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
