বেইজিংয়ে ফিরে আসছে করোনা, স্কুল-কলেজ বন্ধ, বাতিল হচ্ছে বিমান চলাচল
চীনের রাজধানী বেইজিংয়ের একটি কৃষিপণ্যের বাজার থেকে করোনাভাইরাসের গোষ্ঠীবদ্ধ সংক্রমণ শনাক্ত হয় গত শনিবার। সেদিন শনাক্ত হওয়া অধিকাংশই ছিলেন উপসর্গহীন রোগী। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, উপসর্গহীন কোভিড-১৯ সংক্রমিতদের থেকে ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি খুবই কম। তারপরও, ঝুঁকি নিতে চায়নি চীন। প্রথমদিকে সংক্রমণ উৎস ও আশেপাশের ১০টি এলাকায লকডাউন করা হলেও, তা এখন ব্যাপক আকারে করেছে বেইজিং শহর কর্তৃপক্ষ। ফলে, আবারও প্রাণচাঞ্চল্যহীন হয়েছে পড়ছে দেশটির রাজধানী।
সতর্কতামূলক পদক্ষেপের অংশ হিসেবে বাতিল করা হয়েছে বেইজিং থেকে নির্ধারিত বাণিজ্যিক উড়োজাহাজের শত শত ফ্লাইট। আচমকা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ায়, একে-অন্যের কাছ থেকে বিদায় না নিয়েই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন শিক্ষার্থীরা। খবর নিউইয়র্ক টাইমসের।
কর্তৃপক্ষ অবরোধ জারি করছে একের পর এক নতুন আবাসিক এলাকায়। ফলে সীমিত খাবারের মজুদ নিয়েই বাসাবাড়িতে আটকা পড়েছেন অনেক মানুষ। বাড়ি বাড়ি খাবার ডেলিভারি দেওয়ার ব্যবস্থা নিয়েও অভিযোগ জানাচ্ছেন আটকে পড়া লোকজন। নতুন করে করোনার আকস্মিক এ প্রাদুর্ভাবের মধ্যেই স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মীরা প্রতিদিন লাখো মানুষের করোনা পরীক্ষা করছেন।
শনিবার থেকে আজ বুধবার নাগাদ মোট আক্রান্ত হয়েছে ১৩৭ জন। এদের মধ্যে ৩১ জনই শনাক্ত হয়েছে বুধবারে।
চলতি বছরের শুরুর দিকে করোনাভাইরাসের প্রথম ঢেউ মোকাবিলায় চীনজুড়ে যে কঠোর লকডাউন চালু করা হয়েছিল, বেইজিংবাসী এখনও তার মধ্যে পড়েননি। কিন্তু সংক্রমণ হার বাড়তে থাকলে পরিস্থিতি সেদিকেই মোড় নেবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
দেশটির শাসকগোষ্ঠী তথা চীনা কমিউনিস্ট পার্টির জন্য করোনা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে তাদের ভাবমূর্তি জড়িয়ে পড়েছে। জনগণের আস্থা ধরে রাখার কঠিন পরীক্ষায় পড়তে যাচ্ছে তারা। তাই কর্তৃপক্ষ কঠোর পদক্ষেপ নিতে দ্বিধা করবে না এমন আভাসই পাওয়া যাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতেও চীনের অব্যাহত প্রভাব বৃদ্ধির চেষ্টাও এর সঙ্গে জড়িত। সাম্প্রতিক সময়ে, দেশের ভেতরে ও বাইরে চীনের পদস্থ কর্মকর্তাদের ভাইরাস নিয়ন্ত্রণের সফলতা নিয়ে গৌরব করতে দেখা গেছে। ২ কোটি ১০ লাখ জনসংখ্যার বেইজিংয়ে ভাইরাসের এই হানা দেওয়া বিরাট চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিতে পারে তাদের জন্য। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে তাই কোনো রকম ফাঁক রাখতে চাইছেনা কর্তৃপক্ষ।
চীনের সমাজতন্ত্রী দলের হয়ে যারা বেইজিং শহর নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে আছেন, তাদের মাঝে অন্যতম নগরীর পার্টি সেক্রেটারি শাই কি। তিনি ইতোমধ্যেই জিয়ানফেদি কৃষি বাজার থেকে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ায় অধস্তনদের প্রতি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
তবে উহানে করোনাভাইরাসের মহামারি ছড়িয়ে পড়ার পর প্রথমদিকে যে অবহেলা করা হয়েছিল, বেইজিংকে ঘিরে সে ঘটনার পুনরাবৃত্তি চায় না চীন।
বেইজিংয়ের নগরবাসীদের মধ্যে লকডাউনের প্রস্তুতি দৃশ্যমান হচ্ছে। আজ বুঝবার লকডাউনের বাইরে থাকা নগরীর অধিকাংশ রাস্তায় যানবাহন চলাচল করেছে, তবে তা আগের চাইতে অনেক কম।
মানুষের মধ্যেও চাপা উদ্বেগ দেখা গেছে। রেস্তোরাগুলো খোলা আছে বটে, কিন্তু তাদের সরকারি নির্দেশনার আওতায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে, জীবাণুনাশক দিয়ে সবকিছু পরিষ্কার করেই ব্যবসা পরিচালনা করতে বলা হয়েছে। তারপরও খদ্দেরের সংখ্যা ছিল অনেক কম।
শনিবারই বেইজিংয়ে সকল পর্যটন ও ক্রীড়ানুষ্ঠান বাতিল করা হয়। আজ বুধবার নাগাদ বেইজিং বিমানবন্দর থেকে ছেড়ে যাওয়া এবং অবতরণ করা বাণিজ্যিক ফ্লাইটের ৬০ শতাংশ বাতিল করা হয়েছে। সংক্রমণের ভয়ে অনেক যাত্রী ভ্রমণ পরিকল্পনা স্থগিত করায় যাত্রী স্বল্পতায় বাতিল হয়েছে অনেক ফ্লাইট।
ঘর পোড়া গরু যেমন সিঁদুরে মেঘ দেখলে ডরায়, তেমন অবস্থা চলছে যেন বেইজিং নগর প্রশাসন এবং মানুষের মধ্যে।
ঝাও গ্যাং নামক এক চীনা ব্যবসায়ী ও বিমান পরিবহন শিল্পের বিশেষজ্ঞ লেখক বলেন, ''ফ্লাইট বাতিলের মধ্য দিয়ে অনেককিছুই প্রতিভাত হয়। করোনাভাইরাস পরিস্থিতি যেকোনো মুহূর্তে যেকোনো শিল্পকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিতে পারে।''
তবে সবখানে দ্রুত স্থবিরতা নেমে এলেও ব্যতিক্রম দৃশ্য ছিল বুলেট ট্রেন স্টেশনগুলোয়। স্টেশনগুলোর যাত্রী ছাউনিতে ট্রেনের জন্য অনেককে অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। এই যাত্রীদের অধিকাংশই আসলে নগরী ছাড়ছেন, তারা আরও কঠোর লকডাউন চালুর হওয়ার আগেই বেইজিং ছেড়ে চলে যাচ্ছেন।
