উপহার সামগ্রী ব্যবসার নাভিশ্বাস
২০ বছর ধরে রাজধানীর পুরান ঢাকার চকবাজারের বিসমিল্লাহ টাওয়ারে গিফট আইটেম বা উপহার সামগ্রীর ব্যবসা করেছেন ইয়াকুব আহেমদ। করোনাভাইরাসের প্রথম আঘাতের পরই দোকান বন্ধ হয়ে যায় তার।
করোনা থেকে মুক্তি মিলবে, আবার সামাজিক-করপোরেট অনুষ্ঠান শুরু হবে- এমন আশাত কয়েক মাস ধরে দোকান ভাড়া চালিয়ে নিয়েছেন তিনি। করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আসার পর দোকান ভাড়া, কমচারীদের বেতন ও ক্ষতি পোষাতে না পেরে শেষ পর্যন্ত গত সপ্তাহে ব্যবসা ছাড়তে বাধ্য হন।
ইয়াকুব আহমেদ বলেন, 'আমাদের পণ্য মূলত বিলাসজাত। দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কেনার পর মানুষ এসব পণ্য ক্রয় করেন। মানুষের হাতে এখন টাকা নেই। স্কুল-কলেজ বন্ধ, সামাজিক অনুষ্ঠান বন্ধ। কবে চালু হবে, তার ঠিক নেই। তাই ব্যবসা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছি।'
ইয়াকুবের মতোই অন্য উপহার সামগ্রী বিক্রেতারা বলছেন, করোনার ধকলে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার পণ্যের ব্যবসা হুমকির মুখে পড়েছে। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিভিন্ন দিবস, বিয়ে, অনুষ্ঠান ইত্যাদি পালিত না হওয়ায় প্রায় প্রতিটি দোকানেই ৮০-৮৫ শতাংশ বিক্রি কমেছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প ফাউন্ডেশন (এসএমই) এ খাতকে কারোনাকালীন প্রণোদনার তালিকাভুক্ত না করায় এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িতরা সরকার ঘোষিত আর্থিক কোনো ঋণ সুবিধা পাননি।
অনেক ব্যবসায়ী দোকান ভাড়া, কর্মচারীদের বেতন ও ব্যাংক ঋণ পরিশোধে হিমশিম খেয়ে ছেড়ে দিয়েছেন ব্যবসা।
ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা বলছেন, তাদের ব্যাংক ঋণগুলোর কিস্তি পরিশোধের মেয়াদ আরও পিছিয়ে দেওয়া হোক এবং পাশাপাশি ভ্যাট-ট্যাক্স আরোপ বাদ দেওয়া হোক; নয়তো এ ব্যবসায় টিকে থাকা তাদের পক্ষে কঠিন হয়ে যাবে।
ইয়াকুবের মতো অনেকেই দোকান ও ব্যবসা ছেড়ে দিলেও টিকে থাকতে সংগ্রাম করছেন পুরান ঢাকার আরেক ব্যবসায়ী আব্দুল আওয়াল। ১৩ বছর ধরে বিদেশি কৃত্রিম ফুল, হ্যান্ডি ক্র্যাফটস, শো-পিস এবং যাবতীয় গিফট আইটেম আমদানি ও পাইকারিভাবে বিক্রি করছেন তিনি।
দ্য বিজনেস স্টান্ডার্ডের সঙ্গে আলাপকালে আওয়াল বলেন, 'করোনাভাইরাস আসার আগে রোজার মাসে যেখানে ৩০-৪০ লাখ টাকা বিক্রি করতাম, এখন সেখানে বিক্রি বড় জোর ৫ লাখ টাকা। আমার দোকানে আগে বিশজন লোক কাজ করতেন, এখন আছেন মাত্র পাঁচজন। আমি এখন দোকানটি বিক্রি করে দিতে চাচ্ছি; কিন্তু এ অবস্থায় দোকান কেনার মতো ক্রেতা পাচ্ছি না।'
এ অবস্থা শুধু ইয়াকুব আহমেদ ও আবদুল আওয়ালেই নয়, প্রায় অধিকাংশ ব্যবসায়ীই এসব ক্ষতি পোষাতে পারছেন না।
উপহার সামগ্রীর জন্য বিখ্যাত পুরান ঢাকার বিসমিল্লাহ টাওয়ারের দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মনির হোসেন টিবিএসকে বলেন, 'এই ব্যবসায় সারা দেশে ছোট-বড় প্রায় ২০ হাজারের অধিক দোকান রয়েছে। এ খাতে বিনিয়োগ ২ হাজার কোটি টাকার বেশি। ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ৩ লাখের বেশি মানুষ। চাকরি হারিয়েছেন কর্মচারিদের ৭০ শতাংশ। করোনায় এ খাতে বিক্রি কমেছে প্রায় ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ।'
চকবাজারের মিটফোর্ড রোডের বিসমিল্লাহ টাওয়ার, মদিনা আশিক, নিউমার্কেট, চন্দ্রিমা মার্কেট, বাংলামোটর, বেইলি রোড প্রভৃতি এলাকায় ঘুরে দেখা যায় ঘড়ি, চশমা, ব্যাগ, ঘর সাজানোর জিনিসপত্র, গয়না, পুতুল, কার্ড, শো-পিস, ইলেকট্রিক শেভিং কিট, ম্যানিকিউর-পেডিকিউর কিট, টিফিন বক্স, পেন্সিল বক্স, পানির বোতল, চকলেট, ডিআইওয়াই, গৃহস্থালি সরঞ্জাম, ইনফ্লেটেইবল সোফা, ইনফ্লেটেইবল পিলো, ইনফ্লেটেইবল নেক পিলো, মাসাজ মেশিন, টেন্ট, ঘর সাজানোর প্লাস্টিক ফুল, বাসন ধোয়ার সিলিকন গ্লাভস, ফুলদানি, চাবির রিং, সেলাই যন্ত্র, রঙ-বেরঙের বাতি, ইনডোর-আউটডোর স্পোর্টস এক্সেসরিজ ইত্যাদি অসংখ্য সামগ্রীর সমাহার এসব মার্কেটে।
সাধারণত মানুষ জন্মদিন, ঈদ, বিভিন্ন বার্ষিকী, বিভিন্ন দিবস, ধর্মীয় উৎসব, বিয়ে, পারিবারিক পার্টি ইত্যাদিতে উপহার সামগ্রী কিনে থাকে। কিন্তু করোনায় এ সমস্ত বিশেষ অনুষ্ঠান তেমন অনুষ্ঠিত না হওয়ায় দোকানগুলো এখন প্রায় ক্রেতাশূন্য।
চন্দ্রিমা সুপার মার্কেটের শো-পিস দোকানদার জহিদুল ইসলাম টিবিএসকে বলেন, '২০ লাখ টাকার পুজিঁ খাটিয়ে এই ব্যবসায় অনেক বিপাকে আছি। আজকে সারাদিনে একটি পণ্যও বিক্রি করতে পারিনি। মানুষ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য সামগ্রী ও পোশাক কেনার পর টাকা থাকলে এসব শৌখিন পণ্য কেনেন। কিন্ত বর্তমানে মানুষ হাতে টাকা নাই, তাই এসব দোকানে ক্রেতারা আসছেন না।'
করোনার সংকট মোকাবেলায় সরকার প্রণোদনা প্যাকেজ দিলেও উপহার সামগ্রী ব্যবসায়ীরা কিছু পাননি বলে অভিযোগ করেন বিসমিল্লাহ টাওয়ার দোকান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আসলাম হোসেন।
তিনি বলেন, 'এ খাতের ৫০ শতাংশ ব্যবসায়ী ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ব্যবসা করছেন। আমরা সরকারের কাছে আর্থিক সহযোগিতা চাই, ব্যাংক ঋণ পরিশোধের মেয়াদ আরও পিছিয়ে দেওয়া হোক এবং ভ্যাট-ট্যাক্স আপাতত মওকুফ করা হোক। অন্যথায় এ ব্যবসার টিকে থাকা সম্ভব নয়।'
সরকারের প্রণোদনা প্যাকেজ থেকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ঋণ দেওয়ার বিষয়টি তদারকি করছে এসএমই ফাউন্ডেশন।
এই ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মফিজুর রহমান টিবিএসকে বলেন, "যারা সরাসরি উৎপাদনের জড়িত, তারাই সরকারের প্রণোদনা পাবার ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। উপহার সামগ্রী সেক্টরের সঙ্গে জড়িতরা মূলত আমদানিকারক ও বিক্রেতা। তাই তারা এসএমই'র প্রণোদনার আওতায় আসছেন না।"
